July 13, 2026
রাজ্য

গুন্ডাদমন আইন কার্যকর, সংগঠিত অপরাধ দমনে কড়া ক্ষমতা পেল প্রশাসন

সংবাদ কলকাতা: সংগঠিত অপরাধ, তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ রুখতে সোমবার থেকে রাজ্যে কার্যকর হল নতুন ‘গুন্ডাদমন আইন’ (Gunda Act)। শুক্রবার বারুইপুর সফরে এই আইন কার্যকর করার ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার রাজ্যসভার তিন বিজেপি প্রার্থীর মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর তিনি বলেন, “এই আইন খুব দরকার ছিল। ৩৪ বছর কমিউনিস্ট হার্মাদদের সরকার ছিল, তারপর ১৫ বছর তৃণমূলী গুন্ডাদের সরকার ছিল। তাদের জব্দ করার জন্য এই আইনের প্রয়োজন ছিল। বিধানসভায় আমরা আইন পাশ করিয়েছি, রাজ্যপাল অনুমোদন দিয়েছেন।”

নতুন আইনে ‘সমাজবিরোধী কার্যকলাপ’-এর সংজ্ঞা বিস্তৃত করা হয়েছে। জনশৃঙ্খলা নষ্ট করা, তোলাবাজি, সিন্ডিকেট, বেআইনি জমি দখল, সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তি নষ্ট করা, বেআইনি বালি-পাথর বা খনি উত্তোলন, ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি এবং বন ও বন্যপ্রাণীর ক্ষতিসাধনের মতো অপরাধ এই আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

বিলে ‘গুন্ডা’ বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যিনি নিজে অথবা কোনও গ্যাং, সিন্ডিকেট বা অপরাধচক্রের সদস্য বা নেতা হিসেবে অভ্যাসগতভাবে সমাজবিরোধী কার্যকলাপে যুক্ত। অস্ত্র, মাদক, বিস্ফোরক বা ভারতীয় ন্যায় সংহিতার গুরুতর ধারায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও এই আইনের আওতায় আসতে পারেন।

আইন অনুযায়ী, রাজ্য সরকার, পুলিশ কমিশনার, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকার মনোনীত ডিআইজি পদমর্যাদার পুলিশ আধিকারিক প্রয়োজন মনে করলে কোনও ব্যক্তিকে প্রতিরোধমূলকভাবে আটক করার নির্দেশ দিতে পারবেন। শুধু চার্জশিট নয়, পুলিশের রিপোর্ট বা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেও আটকাদেশ জারি করা সম্ভব হবে, যদি প্রশাসনের মনে হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জননিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি।

এই আইনের অধীনে একজন ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত আটক রাখা যাবে। তবে আটকাদেশ কার্যকর হওয়ার পর তিন সপ্তাহের মধ্যে বিষয়টি অ্যাডভাইজরি বোর্ডের কাছে পাঠাতে হবে। হাইকোর্টের বর্তমান বা প্রাক্তন বিচারপতির নেতৃত্বাধীন এই বোর্ড আটকাদেশের যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখে সরকারকে মতামত জানাবে। পর্যাপ্ত কারণ না থাকলে আটকাদেশ প্রত্যাহারের সুপারিশ করতে পারবে বোর্ড।

আটক ব্যক্তিকে সাধারণত পাঁচ দিনের মধ্যে আটক করার কারণ জানাতে হবে এবং নিজের বক্তব্য রাজ্য সরকার ও অ্যাডভাইজরি বোর্ডের সামনে তুলে ধরার সুযোগ থাকবে। তবে জনস্বার্থ, জননিরাপত্তা বা গোপন সূত্র রক্ষার স্বার্থে কিছু তথ্য প্রকাশ না করার ক্ষমতাও সরকারকে দেওয়া হয়েছে।

আইনে প্রশাসনকে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে কোনও ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট জেলা বা এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া যাবে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য। সেই নির্দেশ অমান্য করলে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়াই তল্লাশি চালাতে, যানবাহন থামিয়ে তল্লাশি করতে এবং অপরাধে ব্যবহৃত বলে সন্দেহভাজন সম্পত্তি বা নথি বাজেয়াপ্ত করতে পারবে।

বিলে স্পষ্ট করা হয়েছে, এই আইনের অধীনে সমস্ত অপরাধই কগনিজেবল এবং নন-বেলেবল। অর্থাৎ পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেফতার করতে পারবে এবং জামিন আদালতের বিবেচনার উপর নির্ভর করবে।

এছাড়া, আটক বা বহিষ্কারের নির্দেশ থাকা কোনও ব্যক্তিকে জেনে-শুনে আশ্রয় দিলে সর্বোচ্চ দু’বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

তবে আইনের একটি ধারা ইতিমধ্যেই বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে। বিলে বলা হয়েছে, ‘সৎ উদ্দেশ্যে’ নেওয়া কোনও প্রশাসনিক পদক্ষেপের জন্য রাজ্য সরকার বা কোনও আধিকারিকের বিরুদ্ধে মামলা বা আইনি পদক্ষেপ করা যাবে না। বিরোধীদের একাংশের প্রশ্ন, ‘সৎ উদ্দেশ্য’-র ব্যাখ্যা কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং এই বিধানের অপব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে কি না, তা নিয়েই ভবিষ্যতে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

Related posts

Leave a Comment