July 13, 2026
রাজ্য

রথযাত্রা থেকে শ্রাবণী মেলা— ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণে একাধিক প্রকল্প

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

এক হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা রাজ্য সরকারের

রাজ্যের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং ধর্মীয় পর্যটনের প্রসারে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নবান্নে রাজ্যের জেলাশাসক, পুলিশ প্রশাসন, ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা কমিটি এবং বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের ভার্চুয়াল বৈঠকে তিনি জানান, উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করাও বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পশ্চিমবঙ্গ একসময় শুধু ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানীই ছিল না, এটি শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণদেব, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, স্বামী বিবেকানন্দ, স্বামী প্রণবানন্দ, মা সারদামণি ও রানি রাসমণির মতো মহামানবদের পুণ্যভূমি। কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ এবং দার্জিলিং থেকে দিঘা পর্যন্ত বিস্তৃত রাজ্যের রথযাত্রার ঐতিহ্য শতাব্দীপ্রাচীন। সেই ঐতিহ্যকে আরও সুসংহত করতেই এবার প্রথমবারের মতো রাজ্য সরকার সরাসরি রথযাত্রা উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

এই উপলক্ষে মুখ্যমন্ত্রী দুটি বড় ঘোষণা করেন। রাজ্যের ৭৫টি ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা মেলায় তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের উদ্যোগে বিশেষ সরকারি ‘সেবাকেন্দ্র’ গড়ে তোলা হবে। পুরসভা ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় সেখানে পুণ্যার্থীদের প্রয়োজনীয় নাগরিক পরিষেবা দেওয়া হবে। পাশাপাশি, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বহনকারী ৬০টি রথযাত্রা কমিটিকে পাঁচ লক্ষ টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়া হবে। পুরনো কাঠের রথের সংস্কার ও সংরক্ষণে এই অর্থ ব্যয় করার জন্য কমিটিগুলিকে আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আজ রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে যে বৃক্ষটি রোপণ করা হল, ভবিষ্যতে তা মহীরুহে পরিণত হবে।’

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘বিকাশ ভি হোগা, বিরাসত ভি হোগা’ মন্ত্রের উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, উন্নয়ন এবং ঐতিহ্য— এই দুইকে সমান গুরুত্ব দিয়েই সরকার কাজ করছে। বৈঠকে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, ইসকন এবং ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘোষণা হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী জানান, আবহাওয়া অনুকূল থাকলে শ্রাবণ মাসের প্রতিটি সোমবার তারকেশ্বরগামী জলযাত্রীদের ওপর রাজ্য সরকারের হেলিকপ্টার থেকে গোলাপ ও বিভিন্ন ফুলের ‘পুষ্পবৃষ্টি’ করা হবে। পাশাপাশি তিনি জানান, আগামী ১৪ তারিখ তিনি নিজে তারকেশ্বর ধামে উপস্থিত থাকবেন এবং ১৬ তারিখ ইসকনের আমন্ত্রণে কলকাতার রথযাত্রা উৎসবে অংশ নেবেন।

ধর্মীয় পরিকাঠামো উন্নয়নেও বড় বিনিয়োগের কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, রাজ্যের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী মন্দিরগুলির উন্নয়ন ও সংস্কারের জন্য ‘তীর্থক্ষেত্র সার্কিট’ নামে নতুন প্রকল্প চালু করা হচ্ছে। আগামী দুই বছরে এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিস্তৃত উন্নয়নমূলক কাজ হবে। চলতি অর্থবর্ষে এই খাতে প্রাথমিকভাবে এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। মুর্শিদাবাদের কিরীটেশ্বরী মন্দির-সহ একাধিক ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থানের উন্নয়ন এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত হবে।

মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ পরিচালিত হাসপাতালগুলিকে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ যোজনার আওতায় আনা হয়েছে। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের পরিচালিত শিক্ষা ও কৃষি প্রতিষ্ঠানগুলির উন্নয়নমূলক প্রস্তাবও সরকার গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি কলকাতার শিমলা স্ট্রিটে স্বামী বিবেকানন্দের জন্মভিটের সংরক্ষণের জন্য পাঁচ কোটি টাকার বিশেষ করপাস তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আসন্ন শ্রাবণী মেলাকে সামনে রেখে জলপাইগুড়ির জল্পেশ মন্দির, ভুটান সীমান্তের জয়ন্তী এবং তারকেশ্বর ধামকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পরিষেবা উন্নত করা হচ্ছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। তারকেশ্বর ধামে প্রায় ১৫ কোটি টাকার উন্নয়নমূলক কাজ চলছে। শেওড়াফুলি থেকে তারকেশ্বর পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার পথে প্রতি পাঁচ কিলোমিটার অন্তর সরকারি শিবির তৈরি করা হচ্ছে। সেখানে বিশ্রামের ব্যবস্থা, ওআরএস, বিশুদ্ধ জল এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য অস্থায়ী চিকিৎসা শিবির থাকবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

Related posts

Leave a Comment