30 C
Kolkata
October 27, 2026
রাজ্য

সরশুনা কাণ্ডে ধৃতদের খালি গায়ে হাঁটাল পুলিশ

সংবাদ কলকাতা: বেহালার সরশুনায় এক তরুণ, তাঁর বাবা ও বন্ধুকে নগ্ন করে রাস্তায় হাঁটানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্তদেরই এবার খালি গায়ে ও খালি পায়ে এলাকায় ঘোরাল পুলিশ। মঙ্গলবার সকালে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য তাঁদের সরশুনার ক্ষুদিরামপল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়। কোমরে দড়ি বাঁধা অবস্থায় তিন অভিযুক্তকে পুলিশের পাহারায় হাঁটতে দেখা যায়। তাঁদের দেখতে রাস্তায় ভিড় জমান স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে তদন্তের নামে অভিযুক্তদের এভাবে প্রকাশ্যে হাঁটানো কতটা আইনসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে মানবাধিকার সংগঠন এবং রাজনৈতিক মহলের একাংশ।

রবিবার, ২৫ অক্টোবর সরশুনা থানা এলাকার বাসুন্ধরা পার্ক সংলগ্ন এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। অভিযোগ, এক কিশোরীকে চুম্বন করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক তরুণ, তাঁর বাবা এবং বন্ধুকে আটকে রেখে মারধর করা হয়। পরে তাঁদের বন্দুক দেখিয়ে পোশাক খুলতে বাধ্য করা হয় এবং প্রকাশ্য রাস্তায় প্রায় ৫০ মিটার নগ্ন অবস্থায় হাঁটানো হয় বলে অভিযোগ। ঘটনার একটি ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়।

তরুণের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে সরশুনা থানায় মামলা দায়ের করে পুলিশ। প্রথমে কিশোরীর বাবা প্রদীপ সরকার, মামা রাহুল বর্মন এবং মা রিঙ্কু সরকারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে এই ঘটনায় অভিযুক্ত প্রতিবেশী শঙ্কর সাউকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ, মূল ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা এবং মঙ্গলবার পুলিশি পুনর্নির্মাণের জন্য তিন জনকে নিয়ে যাওয়া—এই দু’টি পৃথক বিষয়।

মঙ্গলবার সকালে পুলিশ যে তিন অভিযুক্তকে এলাকায় নিয়ে যায়, তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রদীপ সরকার, রাহুল বর্মন এবং শঙ্কর সাউ বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের কোমরে দড়ি বাঁধা ছিল। পরনে ছিল হাফপ্যান্ট, গায়ে কোনও জামা ছিল না এবং পায়েও জুতো ছিল না। যে এলাকায় অভিযোগ অনুযায়ী তিন ব্যক্তিকে নগ্ন করে হাঁটানো হয়েছিল, সেই এলাকাতেই অভিযুক্তদের নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশ সূত্রে দাবি, ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্যই এই পদক্ষেপ করা হয়েছিল।

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

ঘটনা নিয়ে সরব হয়েছে মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আলতাফ আহমেদ বলেন, প্রথমে তিন ব্যক্তিকে নগ্ন করে হাঁটানোর ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়। কিন্তু তার পর অভিযুক্তদেরও খালি গায়ে ও খালি পায়ে ঘোরানো কোনওভাবেই পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে। তাঁর বক্তব্য, পুলিশের কাজ আইন রক্ষা করা এবং আইন মেনে তদন্ত চালানো। অভিযুক্তদের প্রকাশ্যে অপমান করা বা শাস্তি দেওয়ার মতো আচরণ করা পুলিশের কাজ হতে পারে না।

আলতাফের অভিযোগ, প্রথম ঘটনার সময় পুলিশ যথাসময়ে পৌঁছলে পরিস্থিতি অন্য রকম হতে পারত। তাঁর মতে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেই পদক্ষেপও আইন মেনেই হওয়া উচিত। অপরাধের তদন্তের নামে কাউকে অপমান করা হলে তা পুলিশের ভূমিকা নিয়েই নতুন প্রশ্ন তৈরি করে।

রাজনৈতিক মহলেও সমালোচনা

সরশুনার ঘটনা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন তৃণমূলের প্রবীণ বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ও। তাঁর মতে, এক পক্ষের অপমানের জবাবে অন্য পক্ষকে একইভাবে অপমান করা সভ্য সমাজের পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়। পুলিশ অভিযুক্তদের খালি গায়ে ও খালি পায়ে হাঁটালেই কি অপরাধের শাস্তি হয়ে যায়, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

এর আগেও রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় অভিযুক্তদের কোমরে দড়ি বেঁধে এলাকায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে পুলিশের তরফে ঘটনার পুনর্নির্মাণের কথা বলা হলেও, সেই প্রক্রিয়ায় অভিযুক্তের সম্মানহানি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।



গত জুনে একটি জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে কলকাতা হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করেছিল, পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে পারে এবং আইন মেনে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। দোষ প্রমাণিত হলে আদালত আইন অনুযায়ী শাস্তিও দিতে পারে। কিন্তু গ্রেপ্তারের নামে ইচ্ছাকৃতভাবে অভিযুক্তের সম্মানহানি করা যায় না। বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত ও বিচারপতি স্মিতা দাস দে-র বেঞ্চের ওই পর্যবেক্ষণ সরশুনার ঘটনার প্রেক্ষিতে ফের আলোচনায় এসেছে।

তদন্তের নামে অপমান, উঠছে প্রশ্ন

সরশুনার ঘটনায় মূল অভিযোগ, কিশোরীকে চুম্বন করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তরুণ, তাঁর বাবা ও বন্ধুকে আটকে রেখে মারধর করা হয়েছিল এবং নগ্ন করে হাঁটানো হয়েছিল। এই অভিযোগের তদন্তের পাশাপাশি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে পুলিশি পুনর্নির্মাণের পদ্ধতি কতটা আইনসম্মত ও প্রয়োজনীয় ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

পুলিশের দাবি, ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্যই ধৃতদের এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তবে সেই প্রক্রিয়ায় তাঁদের খালি গায়ে ও খালি পায়ে হাঁটানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা সামনে আসেনি। ফলে তদন্তের নামে কোনও অপমানজনক আচরণ করা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। অপরাধের অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, অভিযুক্তের দোষ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগে আইন মেনে তদন্ত চালানো এবং তাঁর মর্যাদা বজায় রাখার দায়িত্ব প্রশাসনেরই।

Related posts

Leave a Comment