30 C
Kolkata
October 27, 2026
রাজ্য

ক্ষুদ্রান্ত্রে ফুটো হয়েই মৃত্যু পবনের, দাবি প্রাথমিক রিপোর্টে

সংবাদ কলকাতা: কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ১১ বছরের পবন যাদবের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এল। ভুল ইঞ্জেকশন দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ক্ষুদ্রান্ত্রে ফুটো হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে খবর। পাশাপাশি, চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গঠিত চার সদস্যের তদন্ত কমিটিও রিপোর্ট জমা দিয়েছে। হাসপাতাল সূত্রের দাবি, কমিটির রিপোর্টে ভুল চিকিৎসার অভিযোগের সমর্থনে কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট সামনে আসার পরেই মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব।

হাওড়ার আন্দুলের বাসিন্দা পবন গত রবিবার সকালে পেটে তীব্র ব্যথা নিয়ে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের শিশু বিভাগে ভর্তি হয়েছিল। পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালে দু’টি ইঞ্জেকশন দেওয়ার পরেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং কিছুক্ষণের মধ্যে মৃত্যু হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল চত্বরে উত্তেজনা ছড়ায়। পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ তোলা হয়। বিশেষ করে, ইঞ্জেকশন দেওয়ার পরেই শিশুটির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় চিকিৎসার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। শিশুরোগ বিভাগের অধ্যাপক রাকেশ মণ্ডলের নেতৃত্বে গঠিত ওই কমিটিতে ছিলেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের আরও তিন চিকিৎসক। চিকিৎসার নথি, ব্যবহৃত ওষুধ এবং ঘটনার সময় নেওয়া পদক্ষেপ খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল কমিটিকে।



হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, পবনকে যে ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছিল, তার ব্যাচ নম্বরও পরীক্ষা করা হয়। একই ব্যাচের ওষুধ অন্য রোগীদের দেওয়া হলেও তাঁদের ক্ষেত্রে কোনও সমস্যার খবর পাওয়া যায়নি বলে তদন্ত কমিটির রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে। হাসপাতাল সূত্রের দাবি, এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেও ভুল ইঞ্জেকশন দেওয়ার অভিযোগের সমর্থন মেলেনি। যদিও একই ব্যাচের ওষুধে অন্য রোগীর সমস্যা না হওয়া একাই কোনও নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে ওষুধের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয় না। সে জন্য চিকিৎসার সম্পূর্ণ বিবরণ ও ময়নাতদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ।

ময়নাতদন্তে কী উঠে এল?

মঙ্গলবার পুলিশের হাতে পৌঁছয় পবনের ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট। হাসপাতালের চিকিৎসকদের একাংশের দাবি, রিপোর্টে ক্ষুদ্রান্ত্রে ফুটো থাকার উল্লেখ রয়েছে। চিকিৎসকদের অনুমান, মৃত্যুর কয়েক দিন আগেই শিশুটির শরীরে এই সমস্যা তৈরি হয়ে থাকতে পারে। ময়নাতদন্তের সময় পেটের ভিতরে প্রচুর পরিমাণে পুঁজ পাওয়া গিয়েছে বলেও হাসপাতাল সূত্রে খবর।

চিকিৎসকদের ধারণা, ক্ষুদ্রান্ত্রে ফুটো হওয়ার কারণে পেটের ভিতরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। সেই সংক্রমণ থেকে সেপসিস তৈরি হয়ে শিশুটির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে। গুরুতর সংক্রমণের কারণে শরীরে রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ক্ষুদ্রান্ত্রের দেওয়ালে এমন ফুটো হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে বলা হয় অন্ত্রের ছিদ্র বা পারফোরেশন।

তবে ক্ষুদ্রান্ত্রে ঠিক কী কারণে ফুটো হয়েছিল, তা এখনও নিশ্চিত নয়। সংক্রমণের কারণে অন্ত্রে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, নাকি আগে থেকেই অন্ত্রের কোনও সমস্যা ছিল—সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ থেকে সম্ভাব্য কারণের ইঙ্গিত মিললেও পূর্ণাঙ্গ রিপোর্টের গুরুত্ব রয়েছে।



কেন হতে পারে ক্ষুদ্রান্ত্রে ফুটো?

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রান্ত্রে ফুটো হওয়ার ঘটনা বিরল। বিভিন্ন কারণে এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে। অন্ত্রে আলসার, নির্দিষ্ট ধরনের সংক্রমণ, টাইফয়েড, যক্ষ্মা কিংবা কিছু দীর্ঘস্থায়ী অসুখের সঙ্গে এই সমস্যার সম্পর্ক থাকতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ব্যথার ওষুধ বা স্টেরয়েড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

তবে পবনের মৃত্যুর ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনাগুলির মধ্যে কোনটি দায়ী ছিল, তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হয়নি। শুধু খাদ্যাভ্যাসের কারণে ক্ষুদ্রান্ত্রে ফুটো হয়েছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো তথ্যও প্রকাশ্যে আসেনি। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অন্ত্রে ফুটো হওয়ার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করতে রোগীর আগের শারীরিক অবস্থা, উপসর্গ, সংক্রমণের ধরন এবং অন্যান্য চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য একসঙ্গে বিচার করতে হবে।

হাসপাতাল সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, পবনের পেটে ব্যথার পাশাপাশি দু’-তিন দিন ধরে জ্বরও ছিল। এই তথ্যের সঙ্গে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে চিকিৎসকেরা সংক্রমণের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছেন। যদিও পরিবারের এক সদস্যের দাবি, পবনের আগে থেকে এমন কোনও গুরুতর শারীরিক সমস্যা ছিল না এবং তার খাদ্যাভ্যাস নিয়েও তাঁদের কোনও অভিযোগ ছিল না।

এদিকে, শিশুটির মৃত্যুকে ঘিরে পরিবারের অভিযোগ পুরোপুরি মিটে যায়নি। পরিবারের বক্তব্য, পবনের মৃত্যুর আগে ঠিক কী ধরনের চিকিৎসা করা হয়েছিল এবং কোন পরিস্থিতিতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছিল, তা বিস্তারিতভাবে জানানো প্রয়োজন। মৃতের পরিবারের তরফে রাজেশ প্রসাদ জানিয়েছেন, তাঁরা এখনও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাননি। পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পাওয়ার পরেই মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তাঁরা।

সব মিলিয়ে, পবন যাদবের মৃত্যুর ঘটনায় প্রাথমিক ময়নাতদন্ত ও হাসপাতালের তদন্ত কমিটির রিপোর্ট নতুন তথ্য সামনে এনেছে। ভুল ইঞ্জেকশন দেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি ক্ষুদ্রান্ত্রে ফুটো ও সংক্রমণের বিষয়টিও এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং চিকিৎসায় কোনও গাফিলতি হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সমস্ত রিপোর্ট ও চিকিৎসার নথি একসঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

Related posts

Leave a Comment