নিজস্ব সংবাদদাতা, উত্তর ২৪ পরগনা— নিজের দলের নেতাদের কাছেই বারবার অপমানিত হতে হচ্ছে, এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন হিঙ্গলগঞ্জের বিজেপি বিধায়ক রেখা পাত্র। তাঁর অভিযোগ, পড়াশোনা না জানার কারণে বসিরহাট সাংগঠনিক জেলা নেতৃত্ব তাঁকে ‘ভুল পথে চালিত’ করছে এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ডেকেও অপমান করা হচ্ছে। বিষয়টি দলের উপরমহলের নজরে আনার পাশাপাশি গোটা ঘটনার বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভারও শীর্ষ নেতৃত্বের উপরেই ছেড়ে দিয়েছেন তিনি।
সন্দেশখালির আন্দোলনের অন্যতম মুখ হিসেবে রাজনৈতিক পরিচিতি তৈরি হয়েছিল রেখার। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি তাঁকে বসিরহাট কেন্দ্রে প্রার্থী করেছিল। সেই নির্বাচনে পরাজয়ের পর ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে হিঙ্গলগঞ্জ থেকে তাঁকে প্রার্থী করে দল। এবার সেই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হয়েছেন তিনি। কিন্তু বিধায়ক হওয়ার পরেও সাংগঠনিক জেলা নেতৃত্বের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রেখার।

এই ক্ষোভ থেকেই জেলা নেতৃত্বের বিভিন্ন কর্মসূচিতে যাওয়া কার্যত বন্ধ করে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। নিজের বিধানসভা এলাকার কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকেন বলেও দাবি তাঁর। রেখার কথায়, ‘জেলা থেকে আমাকে ভুল পথে চালিত করা হয়। তাই আমি জেলার কোনও অনুষ্ঠানেই যাই না। নিজের বিধানসভায় থেকে কাজ করি। এটা আমার দল, আমি এত দিন কিছু বলিনি। দলের কাছে যেন বার্তাটা পৌঁছোয়। দল যেন ঠিকঠাক বিচার করে সিদ্ধান্ত নেয়।’
এর পরেই জেলা নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ করেন হিঙ্গলগঞ্জের বিধায়ক। তাঁর দাবি, ‘আমি পড়াশোনা জানি না বলে বসিরহাট সাংগঠনিক জেলার কমিটি আমাকে ভুল পথে চালিত করে। সবসময় অপমান করে। অনুষ্ঠানে ডেকেও অপমান করা হয়। এগুলো আমার পছন্দ হয় না।’
তবে নিজের বিধানসভা এলাকায় তিনি নিয়মিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে জানিয়েছেন রেখা। তাঁর বক্তব্য, কোথায় কোন কর্মসূচি রয়েছে, তা মণ্ডল এবং বুথ স্তরের কর্মীরা জানেন। সব জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। তবে সমাজমাধ্যমে প্রতিটি কর্মসূচির প্রচার করা তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নয় বলেও স্পষ্ট করেছেন।
রেখা বলেন, ‘হিঙ্গলগঞ্জ বিধানসভায় কোথায় কোন অনুষ্ঠানে আমি যাচ্ছি, সেটা সেখানকার মণ্ডল ও বুথ জানে। আমি সব জায়গায় যাই। হয়তো সমাজমাধ্যমে সব পোস্ট করা হয় না। কারণ, আমি সেই সমস্ত নেতার মতো নই, যাঁরা রাজনীতিতে ভেসে থাকার জন্য, বড় নেতা হওয়ার জন্য নিজেকে সারাক্ষণ সমাজমাধ্যমে ভাসিয়ে রাখেন। আমি তেমন রাজনীতি করতে আসিনি।’

নিজের দফতরে মানুষের ভিড়ের কথাও তুলে ধরেছেন বিধায়ক। তিনি জানান, ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত বহু মানুষ নানা সমস্যা নিয়ে তাঁর কাছে আসেন। ফলে নিজের বিধানসভা এলাকার মানুষের কাজকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন।
জেলা নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হলেও বিজেপির প্রতি আস্থা হারাননি বলেও স্পষ্ট করেছেন রেখা। বরং রাজ্যে বিজেপি সরকারের কাজের প্রশংসা করেছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘সাংগঠনিক জেলা কী করল, মণ্ডল স্তরে বা বুথ স্তরে কর্মীরা কে কী করল, তার জন্য দল থেমে থাকে না। দল তার মতো চলে। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার আরও উচ্চ স্তরে যাবে। ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সরকার কাজ করছে। এক সেকেন্ডও সময় নেয়নি কাজ শুরু করতে।’
রেখার অভিযোগ অবশ্য মানতে নারাজ বসিরহাট বিজেপির সাংগঠনিক জেলা নেতৃত্ব। জেলা সভাপতি সুকল্যাণ বৈদ্য বলেন, ‘জেলা কমিটির কর্মী, বিধায়ক হিসাবে যে সম্মান ওঁর প্রাপ্য, আমরা সবসময় তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। ওঁর হয়তো কিছু মনে হয়েছে, সেটা ওঁর ব্যাপার। তা নিয়ে আমার কোনও বক্তব্য নেই।’
আগামী দিনে দলীয় কর্মসূচিতে একসঙ্গে কাজ করার বার্তাও দিয়েছেন জেলা সভাপতি। তাঁর বক্তব্য, সামনে পঞ্চায়েত নির্বাচন। সেই নির্বাচনে সবাইকে একসঙ্গে লড়াই করতে হবে। একই সঙ্গে বিষয়টি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নজরে রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। ফলে বিধায়কের প্রকাশ্য ক্ষোভের পর বসিরহাট সাংগঠনিক জেলায় দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ কোন দিকে যায়, এখন সেটাই দেখার।
