সংবাদ দিল্লি: তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক ঘাসের উপর জোড়াফুল কার দখলে থাকবে, তা নিয়ে এবার সরাসরি নির্বাচন কমিশনের দরজায় দুই শিবির। শনিবার নির্বাচন কমিশনের বেঞ্চে নিজেদের বক্তব্য ও নথি পেশ করল ঋতব্রত শিবির এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির। এবার দুই পক্ষের দাবি-দাওয়া এবং জমা দেওয়া নথি খতিয়ে দেখে প্রতীক ও দলের তহবিল নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন। এর মধ্যেই বিতর্ক আরও বাড়িয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে ‘চিরতরে’ উঠে যাওয়ার বার্তা দিলেন রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। তাঁর দাবি, বিজেপির নেতারাও নাকি তৃণমূলের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাক, সেটাই চান।
শনিবার সকালে প্রথমে নির্বাচন কমিশনে পৌঁছয় ঋতব্রত শিবির। নিজেদের বক্তব্যের পাশাপাশি দলের উপর নিজেদের দাবির পক্ষে বিভিন্ন নথি জমা দেয় তারা। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরও কমিশনের বেঞ্চে গিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। ফলে এখন মূল নজর নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের দিকে।
নিয়ম অনুযায়ী, কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতীক নিয়ে একাধিক গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট দাবিদারদের বক্তব্য, সাংগঠনিক শক্তি, প্রতিনিধিত্ব এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য খতিয়ে দেখে কমিশন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সেই প্রক্রিয়াতেই এবার তৃণমূলের ঘাসফুল প্রতীক নিয়ে শুনানি শুরু হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ নিয়েই কটাক্ষ করেছেন দিলীপ ঘোষ। তিনি বলেন, ‘পুরো দলটাই উঠে গেলে ভাল হয়। দেখা গেল কেউ প্রতীক পেল না। আমরা চাই যে এই দলটা চিরতরে উঠে যাক। অনেক সর্বনাশ হয়েছে পশ্চিমবাংলার। রাজনীতিটাকে কলুষিত করেছে তৃণমূল কংগ্রেস।’
দিলীপের আরও বক্তব্য, বর্তমানে কোন পক্ষকে ‘আসল তৃণমূল’ বলা হবে, সেটাই বড় প্রশ্ন। তাঁর কথায়, ‘তৃণমূল কোথায়, সেটাই তো বোঝা যাচ্ছে না। কুণাল ঘোষের কথায় তৃণমূল মানে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়! তো তিনি যতদিন আছেন তাঁকে দেখলে মনে হবে তৃণমূল কংগ্রেস বলে একটা দল ছিল।’
তবে প্রতীকের লড়াইয়ে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং আইনি অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের যুক্তি, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা তাঁর হাতেই। দলীয় প্রতীক নিয়ে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কাঠামো এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমর্থনের প্রশ্নও তাই গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে বিদ্রোহী শিবির নিজেদেরই আসল তৃণমূল বলে দাবি করছে। দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি দাবির মধ্যেই কমিশনের সামনে প্রতীক এবং দলের তহবিলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রশ্ন উঠেছে। কমিশন কোনও পক্ষকে প্রতীক না দিয়ে তা সাময়িকভাবে ‘ফ্রিজ’ করে রাখতেও পারে—এমন সম্ভাবনাও রাজনৈতিক মহলে আলোচনায় রয়েছে।

প্রতীকের লড়াই শেষ পর্যন্ত আদালত পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কমিশনের সিদ্ধান্ত ঋতব্রত শিবিরের পক্ষে গেলে তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াই শুরু হতে পারে বলে জল্পনা রয়েছে। অতীতে শিবসেনার প্রতীক নিয়ে একনাথ শিন্ডে এবং উদ্ধব ঠাকরে শিবিরের বিরোধেও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের পর মামলা গড়িয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে।
শিবসেনার সেই বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে এখন তৃণমূলের ক্ষেত্রেও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ, দলীয় কাঠামো এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়ে আইনি প্রশ্ন সামনে আসছে। ফলে শুধু ঘাসফুল প্রতীক নয়, তৃণমূলের সাংগঠনিক পরিচয় এবং দলের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, সেটিও বড় হয়ে উঠেছে।
শনিবার দুই শিবিরের বক্তব্য শোনার পর এখন কমিশনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা। ঘাসফুল-জোড়াফুল শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকে, নাকি প্রতীকই আপাতত ‘ফ্রিজ’ হয়ে যায়—সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।
