29 C
Kolkata
September 12, 2026
দেশ

কর্মরত শিক্ষকদের টেট নিয়ে একাধিক প্রশ্ন, চাকরি থাকবে তো? যোগ্যতা নিয়ে বাড়ছে জটিলতা

সংবাদ কলকাতা: কর্মরত প্রাথমিক ও উচ্চপ্রাথমিক শিক্ষকদের টেট নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে রাজ্য। শুক্রবারই জানা গিয়েছে, পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ জানতে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ এবং স্কুল সার্ভিস কমিশনের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে স্কুলশিক্ষা দফতর। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত সামনে আসতেই কর্মরত শিক্ষকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন। কারা টেটের আওতায় পড়বেন, কারা পরীক্ষা দিতে পারবেন, পুরনো নিয়মে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের কী হবে—এই সব প্রশ্নের এখনও স্পষ্ট উত্তর মিলছে না।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে ২০১১ সালের আগে স্কুলে চাকরি পাওয়া শিক্ষকদের নিয়ে। সেই সময় টেট ব্যবস্থা চালু ছিল না। লিখিত পরীক্ষা এবং ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে বিষয়ভিত্তিক নিয়োগ করা হত। ফলে পুরনো নিয়মে নিয়োগ পাওয়া যে সব শিক্ষক বর্তমানে পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ান, তাঁদের কোন স্তরের শিক্ষক হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

শিক্ষানুরাগী ঐক্যমঞ্চের সাধারণ সম্পাদক কিংকর অধিকারী জানান, ১৯৯৮ সাল থেকে স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সময় টেটের কোনও ব্যবস্থা ছিল না। স্নাতক স্তরের পাস কোর্সের ডিগ্রি থাকা শিক্ষকরা সর্বোচ্চ দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াতেন। এই স্তরকে ‘নরম্যাল সেকশন’ বলা হত। অন্যদিকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী শিক্ষকরা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াতে পারতেন, যা ‘পিজি সেকশন’ হিসেবে পরিচিত ছিল।


তখন উচ্চপ্রাথমিক এবং নবম-দশম শ্রেণির মধ্যে বর্তমানের মতো পৃথক বিভাজন ছিল না। ২০১৬ সালের পর উচ্চপ্রাথমিক এবং নবম-দশম স্তর আলাদা করে দেখা শুরু হয়। ফলে পুরনো নিয়মে চাকরি পাওয়া শিক্ষকদের বর্তমান কাঠামোয় ঠিক কোন স্তরের শিক্ষক হিসেবে ধরা হবে, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের ধলতিথা সরলা বিদ্যাপীঠের শিক্ষক অরূপকুমার দে-র অভিজ্ঞতাতেও সেই জটিলতার ছবি উঠে এসেছে। ২০০২ সালে শিক্ষকতায় যোগ দেওয়ার পর ২০০৯ সালে পরীক্ষা দিয়ে বর্তমান স্কুলে আসেন তিনি। স্নাতক স্তরের বেতন পেলেও সপ্তম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ান। তাঁর প্রশ্ন, একই সঙ্গে উচ্চপ্রাথমিক এবং নবম-দশমে ক্লাস নেওয়া শিক্ষকদের কোন স্তরের শিক্ষক হিসেবে ধরা হবে?

অরূপের কথায়, ‘আমি শুধু নবম-দশমের ক্লাস নেব, সেটা হয় না। তা হলে আমি কোন স্তরে পড়লাম? উচ্চপ্রাথমিকের দু’টি ক্লাস এবং নবম-দশমে পড়াই, তা হলে আমাদের মতো শিক্ষকেরা কোন স্তরে?’

পশ্চিম মেদিনীপুরের এক শিক্ষকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। ২০০৫ সালে সংস্কৃত বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে চাকরি পাওয়া ওই শিক্ষক সপ্তম-অষ্টম শ্রেণিতে সংস্কৃত পড়ানোর পাশাপাশি নবম শ্রেণিতে বাংলাও পড়ান। তাঁর প্রশ্ন, এমন অবস্থায় তাঁকে কোন স্তরের শিক্ষক হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তা সরকারকেই স্পষ্ট করতে হবে।

কিংকর অধিকারীর বক্তব্য, পুরনো নিয়োগ ব্যবস্থায় এই ধরনের স্তরভিত্তিক বিভাজন ছিল না। তাই বর্তমানে কর্মরত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে নতুন করে টেটের নিয়ম প্রয়োগ করতে গেলে একাধিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। এই সমস্যার সমাধানের জন্য আগেই রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছিল বলেও দাবি তাঁর।


সমস্যা শুধু কোন স্তরের শিক্ষক টেট দেবেন, তা নিয়েই নয়। কর্মরত বহু শিক্ষকের বর্তমান টেটের ন্যূনতম যোগ্যতাও নেই বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে প্রাথমিক টেটের ক্ষেত্রে দ্বাদশ শ্রেণিতে ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নম্বরের মতো যোগ্যতার শর্ত রয়েছে। উচ্চপ্রাথমিকের ক্ষেত্রে স্নাতক স্তরেও ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নম্বরের যোগ্যতার কথা রয়েছে।

কিন্তু বহু বছর আগে পুরনো নিয়মে চাকরি পাওয়া শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এই যোগ্যতা না থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁরা যখন চাকরিতে ঢুকেছিলেন, তখন এই ধরনের যোগ্যতার শর্ত প্রযোজ্য ছিল না। সরকারি নিয়ম মেনেই তাঁরা নিয়োগ পেয়েছিলেন। এখন নতুন করে যোগ্যতার পরীক্ষা দিতে বলা হলে তাঁদের চাকরির ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই প্রশ্নই সবচেয়ে বড় হয়ে উঠছে।

শিক্ষক মহলের একাংশের আরও প্রশ্ন, স্কুলে শিক্ষক ঘাটতির কারণে অনেক সময় নবম-দশম বা একাদশ-দ্বাদশের শিক্ষককেও পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণির ক্লাস নিতে হয়। নতুন টেট ব্যবস্থা চালু হলে সেই শিক্ষকদের দায়িত্ব ও শ্রেণি বণ্টনেও পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়েও স্পষ্ট নির্দেশের অপেক্ষায় তাঁরা।

ফলে শুক্রবার টেট সংক্রান্ত নির্দেশ সামনে আসার পর থেকেই কর্মরত শিক্ষকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। পরীক্ষা হবে—এই বার্তা মিললেও কারা পরীক্ষায় বসবেন, কাদের বসতেই হবে, পুরনো নিয়মে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনীয় বর্তমান যোগ্যতা না থাকলে তাঁদের চাকরির কী হবে—এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও অধরা।

এখন শিক্ষক মহলের নজর স্কুলশিক্ষা দফতরের পরবর্তী নির্দেশিকার দিকে। পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখের পাশাপাশি যোগ্যতা, স্তর নির্ধারণ এবং পুরনো নিয়মে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের অবস্থান স্পষ্ট না হলে টেট ঘিরে জটিলতা আরও বাড়তে পারে।

Related posts

Leave a Comment