সংবাদ কলকাতা: গণেশ পুজোর উদ্বোধন করে বাঙালি-অবাঙালি বিভেদের রাজনীতির বিরুদ্ধে সরব হলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার সকালে কেষ্টপুরে গণেশ পুজোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গিয়ে তাঁর দাবি, দীর্ঘ বাম শাসন এবং পরবর্তী তৃণমূল সরকারের আমলে সনাতনী সংস্কৃতিকে নানা ভাবে বিভাজিত করার চেষ্টা হয়েছে। সেই বিভেদ সরিয়ে ‘সনাতনী বাংলা’ গড়ার বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী।
গণেশ পুজোকে শুধুমাত্র মহারাষ্ট্রের উৎসব হিসেবে দেখার বিরোধিতা করে শুভেন্দু বলেন, ‘গণপতি বাবা গোটা দেশের সনাতনীদের।’ একই ভাবে দুর্গাপুজোকে শুধু কলকাতার এবং ছটপুজোকে শুধু বিহারিদের উৎসব হিসেবে দেখার বিরুদ্ধেও সরব হন তিনি। তাঁর বক্তব্য, উৎসবের কোনও নির্দিষ্ট ভাষা বা রাজ্যের গণ্ডি নেই। দেশের সনাতনীরা বিভিন্ন উৎসবের সঙ্গে নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে যুক্ত করেছেন।
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘তুমি বাঙালি, গুজরাটি’—এই বিভাজনের প্রাচীর তৈরি করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, ২০২৬ সালে সেই প্রাচীর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এখন সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও পরম্পরা রক্ষার পথে এগোতে হবে।
বাম শাসনকেও এদিন তীব্র আক্রমণ করেন শুভেন্দু। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘ বাম শাসনের সময়ে ধর্ম ও সনাতনী সংস্কৃতিকে অবহেলা করা হয়েছিল। পঞ্জিকা, শাস্ত্র, পুরোহিত, মন্ত্রোচ্চারণ থেকে শুরু করে মহালয়ার মতো ঐতিহ্যের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
শুভেন্দুর বক্তব্য, দুর্গাপুজোর মণ্ডপেও একসময় নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাব বেশি ছিল। তাঁর দাবি, সেখানে স্বামী বিবেকানন্দ, ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ বা সনাতনী ভাবধারার বইয়ের পরিবর্তে মার্কস-লেনিনের সাহিত্যই বেশি দেখা যেত। হনুমান চালিশার মতো ধর্মীয় বিষয়কে জায়গা দেওয়া হত না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসন নিয়েও সরাসরি আক্রমণ শানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, সরকারের শেষ দিকে বাংলাকে ‘জামাতিকরণ’-এর চেষ্টা হয়েছিল। দুর্গাপুজোর বিসর্জনের দিন বদলানো থেকে শুরু করে পুজো উদ্বোধনের সময় নিয়েও তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
শুভেন্দুর দাবি, পঞ্জিকা ও দীর্ঘদিনের পরম্পরা মেনেই উৎসব পালন করতে হবে। তাঁর কথায়, ‘যা পঞ্জিকায় আছে তাই হবে।’ পিতৃপক্ষে পুজোর উদ্বোধনের মতো প্রথারও বিরোধিতা করেন তিনি।
এদিনের বক্তব্যে বাংলাদেশে সনাতনীদের পরিস্থিতির প্রসঙ্গও টেনে আনেন মুখ্যমন্ত্রী। চিন্ময় প্রভুর প্রসঙ্গ তুলে দেশভাগের যন্ত্রণা এবং পূর্ববঙ্গ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসার স্মৃতির কথা বলেন তিনি। নিজের পরিবারের উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরে শুভেন্দু বলেন, তাঁর মাকেও হিন্দু পরিচয়ের কারণে এক কাপড়ে তাঁর বাবার হাত ধরে চলে আসতে হয়েছিল।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং প্রণবানন্দের ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ তুলে শুভেন্দু বলেন, বাঙালি হিন্দুর নিরাপদ অস্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক পরম্পরা রক্ষার ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে হবে। তাঁর দাবি, অবিভক্ত বাংলার মানুষের দেশভাগের যন্ত্রণা আজও শেষ হয়নি।
সবশেষে ঐক্যের বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, নিজের নাম, পরিচয়, ধর্ম, সংস্কার এবং পরম্পরা যাতে কেউ বদলে দিতে না পারে, তার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। গণেশ পুজোর মঞ্চ থেকেই তাই তাঁর রাজনৈতিক বার্তা—বাঙালি-অবাঙালি বিভেদ নয়, সনাতনী পরিচয়ের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ ‘সনাতনী বাংলা’ গড়াই লক্ষ্য।
