27 C
Kolkata
October 28, 2026
রাজ্য

দুই ‘এনকাউন্টার’ ঘিরে প্রশ্ন, আদালতে বিচারের সুযোগ মিলল না কেন?

নিজস্ব সংবাদদাতা, উত্তর ২৪ পরগনা—উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটা ও মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে পুলিশের গুলিতে দুই অভিযুক্তের মৃত্যুর পর একাধিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পুলিশের দাবি, অপরাধের পুনর্নির্মাণের সময় দুই অভিযুক্তই পুলিশকর্মীদের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালানোর চেষ্টা করেছিলেন। আত্মরক্ষার জন্য পাল্টা গুলি চালায় পুলিশ। তাতেই মৃত্যু হয় প্রহ্লাদ দাস ও সামিউল শেখের। কিন্তু পুলিশের এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দুই পরিবারের সদস্যেরা। তাঁদের বক্তব্য, এত পুলিশকর্মীর উপস্থিতিতে কী ভাবে অভিযুক্তেরা আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেলেন? আদালতে বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই তাঁদের মৃত্যু হওয়ায় প্রকৃত ঘটনা জানার সুযোগও কার্যত বন্ধ হয়ে গেল কি না, সেই প্রশ্ন তুলছেন পরিবারের সদস্যেরা।

দুই ঘটনার পরেই পুলিশের বক্তব্য এবং পরিবারের অভিযোগের মধ্যে তৈরি হয়েছে মতবিরোধ। এক দিকে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ, অন্য দিকে পুলিশি পদক্ষেপের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন। ফলে গোটা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

গাইঘাটায় প্রহ্লাদের মৃত্যু, সত্য জানতে চান মা

উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় এক নাবালিকা প্রতিবেশীকে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে রবিবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন প্রহ্লাদ দাস। সোমবার রাতে তাঁকে ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে অপরাধের পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছিল বলে পুলিশের দাবি। সেই সময় প্রহ্লাদ পালানোর চেষ্টা করেন এবং এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে তিন রাউন্ড গুলি চালান বলে অভিযোগ। পুলিশের পাল্টা গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়।

ছেলের মৃত্যুর পর প্রহ্লাদের মা রেখা দাসের বক্তব্যে একাধিক আবেগের প্রকাশ ঘটেছে। এক দিকে ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের গুরুত্ব স্বীকার করেছেন তিনি, অন্য দিকে পুলিশের গুলিতে ছেলের মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, অন্যায় হয়ে থাকলে তার বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু আদালতে বিচার হওয়ার আগেই অভিযুক্তের মৃত্যু হলে অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা থেকে যায়।


ছেলের ব্যবহার করা জিনিসপত্র, এনসিসির পোশাক এবং শংসাপত্র হাতে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রেখা। তাঁর কথায়, ছোটবেলায় প্রহ্লাদ পুলিশে চাকরি করার স্বপ্ন দেখত। কলেজে দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত পড়াশোনা করার পাশাপাশি এনসিসির সঙ্গেও যুক্ত ছিল সে। পুলিশে চাকরি করে দেশের আইন রক্ষা করার ইচ্ছার কথা ছেলেকে বলতে শুনেছেন তিনি। সেই স্মৃতিই এখন আরও বেশি করে তাড়া করছে তাঁকে।

রেখার দাবি, আগে ছেলেকে নেশা করতে দেখেননি তিনি। তবে ঘটনার দিন প্রহ্লাদ মদ্যপান করেছিল বলে সে নিজেই জানিয়েছিল। থানায় ছেলের সঙ্গে শেষবার কথা বলার সময় প্রহ্লাদ নিজের কাজের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেছিল বলেও জানিয়েছেন তিনি।

ছেলের পক্ষ নিয়ে অপরাধকে আড়াল করতে চান না বলে জানিয়েছেন রেখা। তাঁর বক্তব্য, কোনও মেয়ের সঙ্গে যেন এমন ঘটনা আর না ঘটে। কোনও মাকে যেন এ ভাবে সন্তান হারানোর যন্ত্রণা সহ্য করতে না হয়। একই সঙ্গে তাঁর প্রশ্ন, অপরাধের অভিযোগ থাকলেও বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই অভিযুক্তের মৃত্যু হলে সত্য উদঘাটনের পথ কতটা খোলা থাকে? তিনি গোটা ঘটনার প্রকৃত সত্য সামনে আসার দাবি জানিয়েছেন।

সামশেরগঞ্জে সামিউলের মৃত্যু, পরিকল্পনার অভিযোগ পরিবারের

মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে বিজেপি কর্মী সুজিত মণ্ডলের খুনের তদন্তে অভিযুক্ত ছিলেন সামিউল শেখ। গত ২৭ আগস্ট থেকে নিখোঁজ ছিলেন সুজিত। পরে তাঁর খণ্ডবিখণ্ড দেহ উদ্ধার হয়। এই ঘটনায় খুনের অভিযোগে সামিউলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তদন্তে তাঁর এক বান্ধবী তাজকিরা বিবি এবং তাজকিরার ছোট জামাই জনি শেখের নামও উঠে আসে।

পুলিশের দাবি, সামশেরগঞ্জের ডাকবাংলো এলাকার ভুটু মার্কেটের কাছে সামিউলের ভাড়া বাড়িতে সুজিতকে খুন করা হয়েছিল। মঙ্গলবার অপরাধের পুনর্নির্মাণের জন্য সামিউলকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই সময় তিনি এক পুলিশকর্তার পিস্তল ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালাতে শুরু করেন বলে অভিযোগ। আত্মরক্ষা এবং ঊর্ধ্বতন আধিকারিকের নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়। তাতেই সামিউলের মৃত্যু হয় বলে পুলিশের বক্তব্য।

কিন্তু এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ সামিউলের পরিবার। তাঁদের প্রশ্ন, তদন্তের কাজে উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কী ভাবে একজন বন্দি পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেলেন? পরিবারের একাংশের অভিযোগ, সামিউলকে পরিকল্পনা করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা এখনও স্বাধীন ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।


সামিউলের স্ত্রী রাজেদা বিবি জানিয়েছেন, সোমবার ছোট মেয়েকে নিয়ে বহরমপুর কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন তিনি। তখন সামিউল নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছিলেন এবং আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে নিজের বক্তব্য প্রমাণ করার আশ্বাস দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন রাজেদা। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্বামীর মৃত্যুর খবর পান তিনি।

রাজেদার অভিযোগ, গ্রেপ্তারের পর থেকেই তিনি স্বামীর বিরুদ্ধে ওঠা খুনের অভিযোগ মানতে পারেননি। তাঁর দাবি, তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে পুলিশ আগে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। রিমান্ডে নেওয়ার আগে স্বামী তাঁকে ভয় পাওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন বলে দাবি রাজেদার। তাঁর অভিযোগ, তদন্তের নামে সামিউলকে পরিকল্পনা করে হত্যা করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য ও তদন্তের ফল জানা জরুরি।

সামিউলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তাঁকে খুঁজতে স্থানীয় হাসপাতালে এবং থানায় গিয়েছিলেন রাজেদা। পরে বুধবার সকালে পুলিশ তাঁকে জানায়, জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতালের পুলিশ মর্গে সামিউলের দেহ রাখা রয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য দেহ বহরমপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয় বলে জানা গিয়েছে।

সামিউলের পরিবারের অন্য সদস্যেরাও ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। নিহতের বৌদি মোসাম্মৎ মির্জা খাতুনের প্রশ্ন, পায়ে গুলি চালানোর পরিবর্তে সরাসরি বুকে গুলি চালানো হল কেন? তাঁর বক্তব্য, আদালতে বিচার হওয়ার আগেই কেন এই পরিণতি হল, তার উত্তর পাওয়া প্রয়োজন।



পুলিশের দাবি ও পরিবারের অভিযোগ, তদন্তেই মিলবে উত্তর

দুই ঘটনায় পুলিশের বক্তব্য, অভিযুক্তেরা আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং পুলিশ আত্মরক্ষার জন্য পাল্টা গুলি চালায়। অন্য দিকে, পরিবারের সদস্যেরা প্রশ্ন তুলেছেন, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এত পুলিশকর্মীর উপস্থিতিতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হল কী ভাবে। তাঁদের অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়ার সুযোগ না দিয়েই দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছে।

তবে পুলিশের দাবি এবং পরিবারের অভিযোগ—কোনওটিকেই তদন্তের চূড়ান্ত ফল হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার পরিস্থিতি কী ভাবে তৈরি হয়েছিল, ঘটনাস্থলে কারা উপস্থিত ছিলেন, কত রাউন্ড গুলি চলেছিল এবং পুলিশের পদক্ষেপ প্রয়োজনীয় ও আইনসম্মত ছিল কি না, সেই সব প্রশ্নের উত্তর পেতে নিরপেক্ষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলেও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের দায়িত্ব আদালতের। একই সঙ্গে পুলিশের আত্মরক্ষার দাবি কতটা যুক্তিসংগত, তা যাচাই করাও জরুরি। গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জের দুই ঘটনায় শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছিল, তা স্পষ্ট করতে প্রমাণ, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।

Related posts

Leave a Comment