সংবাদ কলকাতা: রাজ্যে শিল্পের প্রসার, নতুন বিনিয়োগ টানা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে নতুন শিল্পনীতি কার্যকর করার পথে এগোল রাজ্য সরকার। বুধবার রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাবিত শিল্পনীতির খসড়ায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামী ৫ নভেম্বর নবান্ন সভাঘরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে নতুন শিল্পনীতি প্রকাশ করা হবে বলে জানানো হয়েছে। এই নীতির মাধ্যমে রাজ্যে শিল্প স্থাপনের পরিবেশ আরও উন্নত করা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে পশ্চিমবঙ্গকে আকর্ষণীয় করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
চলতি বছরের ৯ মে মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার পর থেকে রাজ্যের শিল্প ও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সরকারের দাবি। হুগলি ও বাঁকুড়ার মতো জেলাতেও ভারী ও মাঝারি শিল্পের প্রসারের উপরে জোর দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই শিল্পমহলের একাংশের দাবি ছিল, রাজ্যে বিনিয়োগের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও সুসংহত শিল্পনীতি প্রয়োজন। সেই দাবি মেনেই গত জুন মাস থেকে নতুন নীতি তৈরির কাজ শুরু হয়। রাজ্য সরকারের বিশেষ মন্ত্রিগোষ্ঠী শিল্পবান্ধব নীতির খসড়া তৈরি করে। মুখ্যমন্ত্রী এবং শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়ের তত্ত্বাবধানে তৈরি সেই খসড়ায় বুধবার মন্ত্রিসভার সম্মতি মিলেছে বলে সূত্রের খবর।

নতুন শিল্পনীতির অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে বিনিয়োগের পথে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, শিল্প স্থাপনের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং নতুন উদ্যোগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। শিল্প সংস্থাগুলির দীর্ঘদিনের অভিযোগ, অনুমোদন পেতে দেরি এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক সময় বিনিয়োগের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে বাধার মুখে পড়ে। সেই সমস্যা কাটিয়ে দ্রুত শিল্প স্থাপন ও উৎপাদন শুরু করার উপরে নতুন নীতিতে গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে, তার বিস্তারিত সরকারি ঘোষণার পরই জানা যাবে।
পূর্ব মেদিনীপুরের হলদিয়ায় চ্যাটার্জি গোষ্ঠীর প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের বিষয়টিও রাজ্যের শিল্পমহলে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি, জাপানের বহুজাতিক সংস্থা মিৎসুবিশির এ রাজ্যে বিনিয়োগের আগ্রহের কথাও সামনে এসেছে। এই ধরনের বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে শিল্পের প্রসারের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বিনিয়োগের ঘোষণা এবং বাস্তবে প্রকল্প চালু হওয়ার মধ্যে একাধিক ধাপ থাকে। তাই নতুন শিল্পনীতির কার্যকারিতা বিচার করতে প্রকল্পগুলির অগ্রগতি, উৎপাদন শুরু এবং কর্মসংস্থানের পরিমাণের দিকে নজর থাকবে।
শিল্পের পাশাপাশি কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন নিয়েও বুধবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে একাধিক সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। আগামী ৫ নভেম্বর হুগলি জেলার পুরশুড়া থেকে রাজ্যের প্রায় ৪৮ লক্ষ নথিভুক্ত কৃষকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এককালীন ২ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, এই অর্থ কৃষকদের কাছে সরাসরি পৌঁছে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে রাজ্যের ‘কৃষক বন্ধু’ প্রকল্পের নাম বদলে ‘মুখ্যমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি’ করার প্রস্তাবেও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এই বিষয়ে প্রকল্পের শর্ত, অর্থের উৎস এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সঙ্গে সম্পর্কের বিস্তারিত সরকারি ভাবে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

উন্নয়নমূলক কাজের গতি বাড়াতে বাজেটের অর্থ খরচের হিসাবও পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। যে দপ্তরগুলি তাদের বার্ষিক বরাদ্দের ৩৫ শতাংশ অর্থ ইতিমধ্যে খরচ করেছে, তাদের পরবর্তী কিস্তির অর্থ দ্রুত ছাড়ার জন্য অর্থ দপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি কালীপুজো ও দীপাবলিকে কেন্দ্র করে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রস্তুতি জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলার পরিস্থিতির উপর নজর রাখতে মন্ত্রীদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে বলেও সূত্রের দাবি।
সব মিলিয়ে, ৫ নভেম্বরের ঘোষণা রাজ্যের শিল্পনীতি ও বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ দিশা নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। তবে নতুন নীতি কতটা বিনিয়োগ আনতে পারবে এবং কত মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হবে, তা নির্ভর করবে ঘোষিত পরিকল্পনার বাস্তবায়নের উপর।
