নিজস্ব সংবাদদাতা, মুর্শিদাবাদ—নিউ ফরাক্কার কাছে রেললাইনের নীচে ধসের জেরে শনিবারও উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে ট্রেন পরিষেবা কার্যত বিপর্যস্ত। গত প্রায় ৪০ ঘণ্টা ধরে ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন মেরামতির কাজ চললেও তা এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। পূর্ব রেল জানিয়েছে, মেরামতির কাজ শেষের পথে। তবে কবে থেকে ওই পথে স্বাভাবিক সূচি মেনে ট্রেন চলাচল শুরু হবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
প্রবল বৃষ্টির জেরে নিউ ফরাক্কা স্টেশনের কাছে রেললাইনের নীচের মাটি বসে যাওয়ার পর বৃহস্পতিবার থেকেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। একই এলাকায় বারবার মাটি বসে যাওয়ায় মেরামতির কাজেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশে বালি ভর্তি বস্তা, পাথরকুচি-সহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে মাটি শক্ত করার চেষ্টা চলছে। রেলের ইঞ্জিনিয়ার ও কর্মীরা দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা করছেন।
নিউ ফরাক্কা স্টেশনের কাছ থেকে ধুলিয়ানের দিকে প্রায় ৮০০ মিটার রেলপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। রেললাইনের নীচের মাটি আলগা হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি টানা বৃষ্টির জল ঢুকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। আপ লাইনের একটি অংশ কয়েক ফুট বসে যাওয়ায় ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে মেরামতির কাজ চলাকালীন ফের মাটি বসে যাওয়ায় পরিষেবা স্বাভাবিক করতে সময় আরও বেড়েছে।

এই ধসের জেরে শনিবারও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দূরপাল্লার ট্রেন বাতিল রয়েছে। শতাব্দী, তেভাগা, তিস্তা-তোর্সা এক্সপ্রেসের পাশাপাশি পদাতিক, কাঞ্চনকন্যা এবং দার্জিলিং মেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনও পরিষেবার বাইরে রয়েছে। বাতিলের তালিকায় রয়েছে গুয়াহাটি-হাওড়া সরাইঘাট এক্সপ্রেস, বামনহাট-শিয়ালদহ উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস, বালুরঘাট-শিয়ালদহ এক্সপ্রেস এবং জলপাইগুড়ি রোড-শিয়ালদহ হমসফর এক্সপ্রেস।
এছাড়াও রাধিকাপুর-কলকাতা এক্সপ্রেস, যোগবনী-কলকাতা এক্সপ্রেস, কাটিহার-হাওড়া এক্সপ্রেস, রাধিকাপুর-হাওড়া কুলিক এক্সপ্রেস, বালুরঘাট-কলকাতা তেভাগা এক্সপ্রেস, নিউ আলিপুরদুয়ার-শিয়ালদহ তিস্তা-তোর্সা এক্সপ্রেস এবং মালদহ টাউন-হাওড়া আন্তঃনগর এক্সপ্রেস বাতিল করা হয়েছে। নাহারলাগুন-সাঁতরাগাছি বিশেষ ট্রেন এবং সহর্ষ-শিয়ালদহ হাটেবাজারে এক্সপ্রেসও এই বিপর্যয়ের প্রভাবে পড়েছে।
শুধু দূরপাল্লার ট্রেন নয়, আঞ্চলিক পরিষেবাতেও বড় প্রভাব পড়েছে। শনিবার বাতিল করা হয়েছে মালদহ টাউন-আজিমগঞ্জ যাত্রীবাহী ট্রেন, মালদহ টাউন-সাহেবগঞ্জ মেমু, সাহেবগঞ্জ-আজিমগঞ্জ মেমু, ভাগলপুর-আজিমগঞ্জ যাত্রীবাহী ট্রেন, সাহেবগঞ্জ-মালদহ টাউন মেমু, আজিমগঞ্জ-সাহেবগঞ্জ মেমু, আজিমগঞ্জ-বারহারওয়া যাত্রীবাহী ট্রেন এবং আজিমগঞ্জ-ভাগলপুর যাত্রীবাহী ট্রেন।
পূর্ব রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক শিবরাম মাঝি জানিয়েছেন, মেরামতির কাজ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে। শনিবার তিনি বলেন, ‘কাজ প্রায় শেষের পথে। শীঘ্রই বিস্তারিত সব জানানো হবে।’ তবে ঠিক কখন থেকে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের ট্রেন যোগাযোগ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় জানানো হয়নি। রেল সূত্রে খবর, ক্ষতিগ্রস্ত অংশের নিরাপত্তা পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরেই ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এদিকে রেল পরিষেবা ব্যাহত হওয়ায় চরম সমস্যায় পড়েছেন যাত্রীরা। বহু মানুষ বাধ্য হয়ে বাস ও বিমানের উপর নির্ভর করছেন। ফলে বিকল্প পরিবহণে চাহিদা বেড়েছে। অভিযোগ, এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বেসরকারি বাস ও বিমান পরিষেবায় অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিমানের টিকিটের দাম ১৫ হাজার টাকা এবং বেসরকারি বাসের একটি আসনের ভাড়া ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে যাত্রীদের অভিযোগ।
রেল পরিষেবা দ্রুত স্বাভাবিক করার দাবিতে যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তবে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছে না রেল কর্তৃপক্ষ। ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ পুরোপুরি নিরাপদ বলে নিশ্চিত হওয়ার পরেই স্বাভাবিক গতিতে ট্রেন চালানো হবে। ফলে শনিবারও উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের রেল যোগাযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা বজায় থাকছে।
