এখনও নিখোঁজ ৫০০০
কাঠমান্ডু: ভয়াবহ বন্যা ও হড়পা বানের (Nepal Flood Disaster) প্রায় দেড় সপ্তাহ পর নেপালে (Nepal) উদ্ধার অভিযানে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে। শুক্রবার ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের (Trishuli-3A Hydropower Project) সুড়ঙ্গ থেকে ন’দিন পর দুই নেপালি শ্রমিককে জীবিত উদ্ধারের পর শনিবার আপার ত্রিশূলী-১ (Upper Trishuli-1) প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে আরও এক চিনা নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে। একই দিনে নুয়াকোটের (Nuwakot) ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার হয়েছেন এক প্রৌঢ়াও।
ত্রিশূলী-৩এ-র সুড়ঙ্গ থেকে দুই শ্রমিককে উদ্ধারের পর উদ্ধারকারীরা মনে করেছিলেন, সেখানে আরও কেউ জীবিত অবস্থায় আটকে থাকতে পারেন। সেই আশায় সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত তল্লাশি চালানো হয়। যদিও আর কোনও জীবিত ব্যক্তির সন্ধান মেলেনি, তবুও ওই দুই শ্রমিকের উদ্ধার অভিযানকে ঘিরে নতুন করে তল্লাশিতে গতি এসেছে। শুক্রবারের সফল উদ্ধার অভিযানকে নেপালের চলতি বিপর্যয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শনিবার সকালে আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ২২৫ মিটার দীর্ঘ একটি টানেল (Hydropower Tunnel) থেকে এক চিনা নাগরিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়। প্রায় ১০ দিন ধরে তিনি সেখানে আটকে ছিলেন। কাদা ও ধ্বংসস্তূপে ভরা ওই সুড়ঙ্গ থেকে তাঁকে বের করে এনে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এ দিনই নুয়াকোট জেলার বিদুরে (Bidur) আরও একটি নাটকীয় উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। চারতলা একটি বাড়ির উপরের অংশ কাদামাটির নীচে চাপা পড়েছিল। সেই বাড়ির ভাঙা জানালা দিয়ে ভিতরে ঢুকে এক প্রৌঢ়াকে জীবিত উদ্ধার করেন উদ্ধারকারীরা।
পরিবারের সদস্যেরা ওই মহিলাকে মৃত বলে ধরে নিয়েছিলেন। এমনকি তাঁর শেষকৃত্যও সম্পন্ন করেছিলেন তাঁরা। পরে জীবিত উদ্ধারের খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যেরা হাসপাতালে ছুটে যান। এই ঘটনায় বিপর্যয়ের মধ্যেও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক বিরল নজির সামনে এসেছে।
সরকারি হিসাবে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৩,১০১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে ১,৩৩১ জনের। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশের এখনও পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। মাত্র ৯৮টি দেহ পরিজনদের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। প্রায় ৫,০০০ মানুষ এখনও নিখোঁজ। নিখোঁজদের মধ্যে ৫৮৯ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।

এই বিপর্যয়ে নেপালের পরিকাঠামোও ভয়াবহ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির (Hydropower Projects) একাধিক সুড়ঙ্গে এখনও নিখোঁজ শ্রমিকদের সন্ধান চলছে। আন্তর্জাতিক দলগুলিও উদ্ধার অভিযানে সহায়তা করছে।
অন্য দিকে, বিপর্যয়ের পর গৃহহীন মানুষের জন্য রাসুয়া, কাঠমান্ডু, নুয়াকোট এবং ধাড়িংয়ে ৪১টি হোল্ডিং সেন্টার (Relief Shelters) চালু করা হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ৩,৯৮২ জন সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন।
তবে ত্রাণশিবিরগুলিতেও বাড়ছে স্বাস্থ্য-উদ্বেগ। ধ্বংসস্তূপ থেকে এখনও পচা ও আধপচা দেহ উদ্ধার হচ্ছে। দীর্ঘ সময় জল-কাদায় থাকার ফলে মৃতদেহ থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। দেবীঘাটের একটি বিদ্যালয় ভবনে ত্রাণশিবির চালানো হচ্ছে। শিবিরের চারপাশে এখনও ধ্বংসস্তূপ, জৈব বর্জ্য এবং মাছির উপদ্রব রয়েছে। তাই খাবার সংরক্ষণ এবং ত্রাণসামগ্রী ব্যবস্থাপনায় বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে।
বিপর্যয়ের ক্ষয়ক্ষতির হিসাবও তৈরি করেছে নেপাল সরকার। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৩৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক পুনর্গঠনের জন্য আগামী ছ’মাসে প্রায় ৭৯৬ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে হিসাব করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন (Climate Change) ও উষ্ণায়নের প্রভাবকে এই ধরনের বিপর্যয়ের সঙ্গে যুক্ত করে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবিও তুলতে চাইছে নেপাল।

এর মধ্যেই ধারচুলা জেলার ভাট্টারে নতুন করে ধস নেমেছে। ধসের জেরে চৌলানি নদীর গতিপথ আংশিক ভাবে আটকে গিয়েছে। আরও ধস নামলে নদীর পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে প্রশাসন। নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছে এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
একদিকে মৃতদেহের সংখ্যা বাড়ছে, অন্য দিকে হাজার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ। তার মধ্যেই সুড়ঙ্গ এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে পর পর জীবিত মানুষকে উদ্ধার করার ঘটনা নেপালের উদ্ধার অভিযানে নতুন মনোবল তৈরি করেছে। ফলে শেষ সম্ভাবনাটুকু পর্যন্ত নিখোঁজদের খোঁজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে উদ্ধারকারী দল।
