সংবাদ কলকাতা: শিক্ষক নিয়োগ থেকে বকেয়া মহার্ঘভাতা, বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো থেকে পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন— শিক্ষাক্ষেত্রে একাধিক বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার নিউ টাউনের কনভেনশন সেন্টারে বিদ্যালয় শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা দপ্তরের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বিদ্যাসাগর শিক্ষা সম্মান’ অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, শিক্ষক নিয়োগের গোটা প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও ত্রুটিমুক্ত করা হবে। সুপ্রিম কোর্ট এবং কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশ মেনেই আগামী দিনে নিয়োগ হবে। কোনও ধরনের বেআইনি কাজ বা অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না বলেও কড়া বার্তা দিয়েছেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, পূর্বতন সরকারের সময়ে শিক্ষক নিয়োগে অস্বচ্ছতার কারণে শিক্ষকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়েছিল। সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটিয়ে শিক্ষকদের সম্মান ফিরিয়ে আনা এবং বিদ্যালয়গুলিকে আধুনিক করে তোলাই নতুন সরকারের লক্ষ্য। তাঁর বক্তব্য, শুধু ভাষণ বা ঘোষণায় নয়, কাজের মাধ্যমেই শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে চায় সরকার।
শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের বকেয়া মহার্ঘভাতা নিয়েও এদিন গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্য সরকার পোষিত বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী এবং অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের বকেয়া মহার্ঘভাতা নিয়ে কলকাতা হাই কোর্ট রাজ্যের অবস্থান জানতে চেয়েছে। আগামী ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজ্যকে রিপোর্ট দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিষয়টি এখনও আদালতের বিচারাধীন। ইন্দু মলহোত্র কমিটি যে সিদ্ধান্ত দেবে, রাজ্য সরকার তা মেনে চলবে।
মুখ্যমন্ত্রীর হিসাব অনুযায়ী, বকেয়া মহার্ঘভাতা মেটাতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। একদিনে এত বিপুল অর্থ দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে কমিটির নির্দেশ অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে বকেয়া মেটানোর চেষ্টা করবে সরকার। তাঁর কথায়, মহার্ঘভাতা শুধু অতিরিক্ত অর্থ নয়, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সময়ে কর্মীদের আর্থিক সুরক্ষার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
শিক্ষকদের কাজের চাপ কমানোর উপরও জোর দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, শিক্ষকরা যাতে পড়ানোর পরিবর্তে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ, খাবারের হিসাব কিংবা অন্যান্য দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে ব্যস্ত না হয়ে পড়েন, তার জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষাকর্মী প্রয়োজন। বিদ্যালয়ের রান্নাঘর, বিদ্যুৎ, পানীয় জল, শৌচালয়, পাখা-সহ মৌলিক পরিকাঠামোর উন্নয়নের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক করার লক্ষ্যে ‘সিএম শ্রী’ প্রকল্প চালুর ঘোষণাও করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ, ডিজিটাল গবেষণাগার, উন্নত গ্রন্থাগার এবং খেলাধুলার পরিকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমাঞ্চলের জন্য ক্রীড়া উৎকর্ষ কেন্দ্র গড়ে তোলার কথাও জানিয়েছেন তিনি। বিদ্যালয়ে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি ছাত্রীদের পৃথক শৌচালয় এবং নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
পাঠ্যক্রমেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। পশ্চিমবঙ্গের গড়ে ওঠার ইতিহাস এবং রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা পাঠ্যপুস্তকে যথাযথভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, স্বামী বিবেকানন্দ এবং সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের শিক্ষাভাবনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পুঁথিগত জ্ঞান অর্জন নয়। পড়ুয়াদের চিন্তাশক্তি, বুদ্ধিবৃত্তি, শরীরচর্চা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধও গড়ে তুলতে হবে।
বিদ্যালয়ে খেলাধুলার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং শরীরচর্চার উপর জোর দেওয়ার কথাও বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, গত কয়েক বছরে শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক অবহেলিত হয়েছে। সেই জায়গাগুলিকে ফের শক্তিশালী করে শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশ উন্নত করার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি।
শিক্ষক দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও শিক্ষকদের সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন। সমাজমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শিক্ষক দিবসের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীও শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, একজন শিক্ষক শুধু বইয়ের জ্ঞান দেন না, জীবনের পথে এগিয়ে চলার সাহসও জোগান।
পড়ুয়াদের মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়েও সতর্ক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিশেষ করে শিশুদের হাতে মোবাইল তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার পড়াশোনা এবং শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
