৮০ হাজারের বেশি স্কুলে ২৯৬.৬৪ কোটি টাকার অনুদান
সংবাদ কলকাতা: রাজ্যের শিক্ষা পরিকাঠামো শক্তিশালী করতে একগুচ্ছ বড় ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। চলতি অর্থবর্ষে প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষক, শিক্ষিকা, অধ্যাপক, অধ্যাপিকা এবং শিক্ষাকর্মী নিয়োগের পাশাপাশি তিন বছর ধরে বকেয়া থাকা কম্পোজিট স্কুল গ্র্যান্ট হিসেবে ৮০ হাজারের বেশি সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ের জন্য ২৯৬.৬৪ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৪২ হাজার ১৯২ জন পার্শ্বশিক্ষকের মাসিক ভাতা ৫ হাজার টাকা বৃদ্ধির সিদ্ধান্তও জানানো হয়েছে।
নবান্নে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী না করে কোনও রাজ্যের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাঁর বক্তব্য, রাস্তা, সেতু বা বড় বড় পরিকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি একটি আধুনিক ও দক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। সেই উদ্দেশ্যেই শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক নিয়োগ এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী জানান, বাজেটে ঘোষিত ১২ হাজার নিয়োগের পাশাপাশি ধাপে ধাপে আরও ৩৮ হাজার শিক্ষক, শিক্ষিকা, অধ্যাপক, অধ্যাপিকা এবং শিক্ষাকর্মী নিয়োগ করা হবে। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার নতুন নিয়োগের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগ সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে বলেও তিনি দাবি করেন।
দীর্ঘ তিন বছর ধরে কম্পোজিট স্কুল গ্র্যান্ট না পাওয়ায় আর্থিক সমস্যার মুখে পড়েছিল বহু বিদ্যালয়। সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে রাজ্যের ৮০ হাজার ৩৭৫টি সরকারি, সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত এবং সরকারি স্পন্সরড বিদ্যালয়ের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি ২৯৬.৬৪ কোটি টাকা পাঠানোর ঘোষণা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, আরটিজিএস এবং নেট ব্যাঙ্কিংয়ের মাধ্যমে এই অর্থ সরাসরি বিদ্যালয়গুলির অ্যাকাউন্টে পাঠানো হচ্ছে। বিদ্যালয়ের রক্ষণাবেক্ষণ, ছোটখাটো সংস্কার, পানীয় জল, বিদ্যুৎ এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী কেনার ক্ষেত্রে এই অনুদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, কম্পোজিট গ্র্যান্ট প্রকল্পে মোট অর্থের ৬০ শতাংশ দেয় কেন্দ্র এবং বাকি ৪০ শতাংশ বহন করে রাজ্য সরকার। অতীতে প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এই অর্থ বিদ্যালয়গুলিতে পৌঁছায়নি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই জট কাটিয়ে দ্রুত অর্থ বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

শিক্ষকদের আর্থিক স্বস্তি দিতেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ৪২ হাজার ১৯২ জন পার্শ্বশিক্ষকের মাসিক ভাতা ৫ হাজার টাকা বৃদ্ধি করা হবে। পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করতে স্কুল সার্ভিস কমিশনের কাঠামোয় পরিবর্তনের কথাও জানান তিনি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে বাকি থাকা সাক্ষাৎকার দ্রুত সম্পন্ন করা হবে বলেও আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ বাস্তবায়নের দিকেও সরকার এগোচ্ছে বলে জানান তিনি। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পাশাপাশি ভারতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের পরিচিত করানোর উপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা এবং স্কুল শিক্ষাকে পৃথক প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ডিজিটাল শিক্ষার প্রসারে ১,২০০-র বেশি সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ে আধুনিক ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রযুক্তি চালুর ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে গ্রামীণ ও পিছিয়ে থাকা জেলার বিদ্যালয়গুলিকে। উচ্চমাধ্যমিক স্তরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং এবং ডেটা সায়েন্সের মতো আধুনিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘দীক্ষা’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করা হবে। পাশাপাশি গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহ দিতে রাজ্যের ১,০০০টি সরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অটল টিঙ্কারিং ল্যাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। ‘পিএম-শ্রী’ প্রকল্পের আওতায় বিদ্যালয়ের সংখ্যাও ৬০০ থেকে বাড়িয়ে ৮০০ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

মিড-ডে মিল প্রকল্পেও একাধিক পরিবর্তনের ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ১ আগস্ট থেকে প্রাথমিক স্তরের ছাত্রছাত্রীদের জন্য মাথাপিছু বরাদ্দ ১০ টাকা করা হবে। একই সঙ্গে পরীক্ষামূলকভাবে কলকাতার একটি এলাকায় ইসকনের মাধ্যমে মিড-ডে মিল পরিবেশন শুরু হবে। তবে মিড-ডে মিল থেকে ডিম বাদ দেওয়া হচ্ছে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি অতিরিক্ত ডিম সরবরাহের ব্যবস্থাও করা হবে।
এ দিন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, রাজ্যের দুটি জনপ্রিয় সামাজিক প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করা হচ্ছে। ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পের নতুন নাম হবে ‘কন্যারত্ন’ এবং ‘সবুজ সাথী’ প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে রাখা হবে ‘সারথী’। তবে প্রকল্পগুলির সুবিধা আগের মতোই চালু থাকবে বলে তিনি স্পষ্ট করেছেন।
