September 14, 2026
দেশ বিদেশ

ব্রিকসে বড় সাফল্য ভারতের, মিটল ইরান-আমিরশাহি দূরত্ব

রিও ডি জেনেইরো—১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। ধীরে ধীরে দেশে ফিরছেন আমন্ত্রিত রাষ্ট্রপ্রধানেরা। এই সম্মেলনকে ঘিরে গত তিন দিনে ১৫টিরও বেশি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রাশিয়া, চিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও আলাদা করে বৈঠক করেছেন তিনি। ফলে এবারের ব্রিকস সম্মেলন থেকে ভারত কী পেল এবং নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সাফল্য কতটা—তা নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা।

অত্যন্ত জটিল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যে এবারের ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইরানকে কেন্দ্র করে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের পরিস্থিতি, চার বছর পেরিয়েও রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের অবসান না হওয়া এবং ভারত-চিন-সহ একাধিক দেশের সঙ্গে আমেরিকার শুল্ক সংঘাত—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বাণিজ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

এই পরিস্থিতিতে এবারের ব্রিকস সম্মেলন ভারতের জন্য বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা ছিল বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তবে সেই পরীক্ষায় ভারত যথেষ্ট সফল বলেই মনে করা হচ্ছে। মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সদস্য দেশগুলিকে এক মঞ্চে ধরে রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সুযোগ তৈরি করা নয়াদিল্লির অন্যতম সাফল্য।


ইরান-আমিরশাহি বৈঠক

এবারের ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের অন্যতম বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উঠে এসেছে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রতিনিধিদের বৈঠক। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আবু ধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ান।

গত কয়েক মাস ধরে দুই দেশের মধ্যে তীব্র সংঘাতের আবহ ছিল। সেই পরিস্থিতিতে ব্রিকসের মঞ্চে দুই রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে আলোচনা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। বৈঠকের পরে ইরানি দূতাবাসের তরফে পেজ়েশকিয়ানের বক্তব্য তুলে ধরে জানানো হয়, ‘আলোচনা খুবই ভাল হয়েছে। অতীতকে পিছনে রেখে আমরা ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর ব্যাপারে সম্মত হয়েছি।’

এই বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করার আরও একটি কারণ রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সামরিক অভিযান এবং তার পাল্টা প্রত্যাঘাত গোটা পশ্চিম এশিয়াকে অস্থির করে তুলেছে।

সংঘাতের প্রভাব ভারতের উপরও

ইরান-আমেরিকা ও ইজরায়েলের সংঘাতের সময় হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল আরও বড় উদ্বেগ। পশ্চিম এশিয়া থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে খনিজ তেল পরিবহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ এই প্রণালী। সংঘাতের জেরে সেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় বিশ্ব বাজারে তেলের দামও বেড়েছে।

ইরানের পাল্টা সামরিক অভিযানে আমিরশাহির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। মার্কিন সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি তেল পরিশোধনাগার, বন্দর, বিমানবন্দর এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোকেও নিশানা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।

এই পরিস্থিতিতে ইরানের সামরিক পদক্ষেপের শুরু থেকেই কড়া সমালোচনা করে এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। চলতি বছরের মে মাসে নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলির বিদেশমন্ত্রীদের বৈঠকেও দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছিল। তর্কাতর্কির জেরে সেই সময় যৌথ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।


চার মাসের মধ্যে ব্রিকসের মঞ্চে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠক এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে ইতিবাচক বার্তা সেই পরিস্থিতিতে ভারতের কূটনৈতিক ভূমিকার গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

ভারতের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি অশান্ত হওয়ায় আরব দেশগুলি থেকে খনিজ তেল আমদানিতে সমস্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তার উপর বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে সরাসরি তার প্রভাব পড়তে পারে ভারতের অর্থনীতিতে।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারতীয় পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল নিয়েও নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত কমানোর যে কোনও উদ্যোগ ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক স্বার্থের দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই পরিস্থিতিতে ব্রিকসের মঞ্চে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মধ্যে আলোচনার দরজা খোলা এবং মতপার্থক্য কমানোর চেষ্টা নয়াদিল্লির জন্য কূটনৈতিকভাবে বড় সাফল্য বলেই মনে করা হচ্ছে। একইসঙ্গে রাশিয়া, চিন ও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একাধিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও ভারতের বহুমুখী কূটনীতির ছবিটা স্পষ্ট করেছে।

Related posts

Leave a Comment