একাধিক বড় ঘোষণায় নতুন সরকারের বার্তা
সংবাদ কলকাতা: রাজ্যের ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং পরিকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিল নতুন সরকার। বিধানসভায় বাজেট পেশ করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত জানান, দীর্ঘদিনের আর্থিক সঙ্কট ও ঋণের বোঝা থেকে রাজ্যকে বের করে এনে নতুন উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই এবারের বাজেটে একাধিক জনমুখী প্রকল্প, নতুন নিয়োগ, ভাতা বৃদ্ধি এবং বৃহৎ পরিকাঠামো বিনিয়োগের ঘোষণা করা হয়েছে।
বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হল রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে এক লক্ষ শূন্যপদ পূরণ। সরকারের দাবি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে যুব সমাজের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া হবে। নিয়োগের মধ্যে থাকছে ২০ হাজার পুলিশ কর্মী, ৫০ হাজার শিক্ষক, অধ্যাপক ও অশিক্ষক কর্মী এবং এক হাজার ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফ্রন্টিয়ার বা রাইফেলস কর্মী। এছাড়া অন্যান্য সরকারি দপ্তরেও নিয়োগ করা হবে। মোট শূন্যপদের ৩০ শতাংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বেকার যুবক-যুবতীদের জন্যও বড় ঘোষণা করা হয়েছে বাজেটে। ‘ভরসা’ নামে নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে স্নাতক যুবক-যুবতীদের মাসে ৩ হাজার টাকা এবং অন্যান্য যোগ্য আবেদনকারীদের মাসে ২ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। সরকারের মতে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এই প্রকল্প যুব সমাজকে আর্থিকভাবে কিছুটা স্বস্তি দেবে।
সরকারি কর্মচারীদের জন্যও সুখবর রয়েছে। বর্তমানে প্রাপ্য মহার্ঘ ভাতার সঙ্গে আরও ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ফলে মোট ডিএ বেড়ে ৩৮ শতাংশে পৌঁছবে। একই সুবিধা পাবেন পেনশনভোগীরাও। আগামী ১ অক্টোবর থেকে বর্ধিত ডিএ কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে।
পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে ১,২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারের আশা, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ উপকৃত হবেন এবং কৃষিক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
শিক্ষাক্ষেত্রেও একাধিক বড় ঘোষণা করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গে একটি আইআইটি এবং একটি আইআইএম স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি স্কুল শিক্ষার জন্য প্রায় ৪৪ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা এবং উচ্চশিক্ষার জন্য ৭ হাজার ১৬৮ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে ২৪ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সুন্দরবনের মতো দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্য পরিষেবা আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে জলপথ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সুন্দরবনের উন্নয়নের জন্য আলাদা করে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। দুর্গম দ্বীপাঞ্চলে নতুন জেটি নির্মাণ, জলপথ পরিবহণের উন্নয়ন এবং সৌরচালিত নৌকা ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের মতে, এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জীবিকার সুযোগ আরও সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বয়স্ক, বিধবা এবং বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের মাসিক পেনশন ৫০০ টাকা বৃদ্ধি করার ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি তফসিলি জাতির আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ গ্রামকে উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
খাদ্য সুরক্ষার বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিয়েছে। বর্তমানে শহরাঞ্চলে ৪০০টি ‘মা আহার’ কেন্দ্র চালু রয়েছে। সেখানে মাত্র ৫ টাকায় পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হয়। আগামী দিনে আরও ২১০টি নতুন কেন্দ্র চালুর ঘোষণা করা হয়েছে।
পরিবহণ ও নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির উন্নয়নেও জোর দেওয়া হয়েছে। দুর্গাপুর-আসানসোল এবং শিলিগুড়ির মধ্যে মেট্রো সংযোগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে সমীক্ষা চালানো হবে। একইসঙ্গে ভাগীরথী ও হুগলি নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য ১০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। নতুন জেটি নির্মাণ, বাজার পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং মৎস্যচাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রেও বড় পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন জেলা হিসেবে কলকাতা, বসিরহাট, সুন্দরবন, জঙ্গিপুর এবং আরামবাগ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন মহকুমা, পুরসভা এবং পুলিশ জেলা তৈরির ঘোষণাও করা হয়েছে।
জননিরাপত্তার জন্য ‘ডায়াল ১১২’ জরুরি পরিষেবা চালুর কথা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিটি থানায় জরুরি পরিষেবার জন্য একটি করে গাড়ি মোতায়েন করা হবে। এই প্রকল্পে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি ‘আপনার সরকার আপনার পাশে’ নামে নতুন জনসংযোগ কর্মসূচি চালুর ঘোষণাও করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য ৪ লক্ষ ৩৮ হাজার ৭৭৫ কোটি ২৯ লক্ষ টাকার নিট বাজেট প্রস্তাব পেশ করেছে সরকার। কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিকাঠামো উন্নয়নকে কেন্দ্র করে তৈরি এই বাজেট আগামী দিনে রাজ্যের অর্থনীতি ও প্রশাসনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহল।
