প্রথম বাজেটেই একগুচ্ছ বড় ঘোষণা বিজেপি সরকারের
সংবাদ কলকাতা: পালাবদলের পর বাংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করে একাধিক জনমুখী ঘোষণা করল বিজেপি সরকার। রাজ্য সরকারি কর্মীদের জন্য ২০ শতাংশ অতিরিক্ত মহার্ঘ ভাতা বৃদ্ধি, এক লক্ষ সরকারি চাকরি, মহিলাদের জন্য মাসিক আর্থিক সহায়তা, প্রবীণ নাগরিকদের পেনশন বৃদ্ধি থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় একাধিক প্রকল্পের ঘোষণা করলেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য ৪ লক্ষ ৩৮ হাজার ৭৭৫ কোটি ২৯ লক্ষ টাকার বাজেট প্রস্তাব পেশ করে তিনি দাবি করেন, দীর্ঘদিনের আর্থিক অব্যবস্থাপনার পর বাংলাকে উন্নয়নের নতুন পথে ফিরিয়ে আনাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য।
বাজেটের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল রাজ্য সরকারি কর্মীদের জন্য মহার্ঘ ভাতা বৃদ্ধি। অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেন, বর্তমানে কর্মীরা ১৮ শতাংশ হারে ডিএ পাচ্ছেন। তার সঙ্গে অতিরিক্ত ২০ শতাংশ ডিএ যোগ করা হবে। ফলে আগামী ১ অক্টোবর থেকে রাজ্য সরকারি কর্মীরা মোট ৩৮ শতাংশ হারে মহার্ঘ ভাতা পাবেন। একইসঙ্গে পেনশনভোগীরাও অতিরিক্ত ডিয়ারনেস রিলিফ পাবেন। দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় হারে ডিএ-র দাবিতে আন্দোলন করে আসা সরকারি কর্মীদের জন্য এই ঘোষণা বড় স্বস্তি বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীরা ৫৮ শতাংশ হারে ডিএ পান। ফলে রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে ডিএ ব্যবধান অনেকটাই কমে এল বলে প্রশাসনিক মহলের ধারণা।
বাজেট বক্তৃতায় পূর্বতন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আর্থিক নীতিরও তীব্র সমালোচনা করেন স্বপন দাশগুপ্ত। তিনি দাবি করেন, নতুন সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে ৮ লক্ষ ১৫ হাজার ৬৯১ কোটি টাকার বিশাল ঋণের বোঝা পেয়েছে। অর্থমন্ত্রীর কথায়, এই বিপুল ঋণ রাজ্যের আর্থিক অবস্থাকে গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতা এবং কঠোর আর্থিক সংস্কারের মাধ্যমে সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়ে আশাবাদী বর্তমান সরকার।
বাজেটে কর্মসংস্থানের উপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেন, রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে এক লক্ষ শূন্যপদ পূরণ করা হবে। এর মধ্যে ২০ হাজার পুলিশ কর্মী নিয়োগ করা হবে। ৫০ হাজার শিক্ষক, অধ্যাপক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলসে এক হাজার নিয়োগ হবে। মোট শূন্যপদের ৩৩ শতাংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। পাশাপাশি যেখানে সম্ভব, সেখানে ১০ শতাংশ পদ অগ্নিবীরদের জন্য সংরক্ষণের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
নারী ক্ষমতায়নকে এবারের বাজেটের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছে সরকার। সেই লক্ষ্যেই চালু করা হচ্ছে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’। এই প্রকল্পের আওতায় ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী যোগ্য মহিলাদের প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। অর্থমন্ত্রী জানান, সরাসরি আধার সংযুক্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এই টাকা পাঠানো হবে। প্রকল্পটির জন্য ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। সরকারের দাবি, এর ফলে লক্ষ লক্ষ মহিলা আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ পাবেন।
সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বয়স্ক, বিধবা এবং বিশেষভাবে সক্ষম নাগরিকদের মাসিক পেনশন ৫০০ টাকা বৃদ্ধি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ফলে বর্তমানে যাঁরা এক হাজার টাকা করে ভাতা পান, তাঁরা এবার থেকে মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা পাবেন। এই সিদ্ধান্তে লক্ষাধিক পরিবার উপকৃত হবে বলে সরকারের আশা।
স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সংক্রান্ত ক্ষেত্রেও একাধিক ঘোষণা করা হয়েছে। আশাকর্মী ও অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের মাসিক পারিশ্রমিক বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পারিশ্রমিক বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন তাঁরা। এছাড়া হোম গার্ডদের মাসিক ভাতাও ২ হাজার টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহ দিতে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। কলেজে অধ্যয়নরত অবিবাহিত ছাত্রীদের জন্য এককালীন ৫০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারের মতে, আর্থিক সমস্যার কারণে যাতে কোনও ছাত্রী পড়াশোনা বন্ধ না করেন, সেই লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
খাদ্য সুরক্ষার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে শহরাঞ্চলে ৪০০টি ‘মা আহার’ কেন্দ্রের মাধ্যমে মাত্র ৫ টাকায় ডিম, মাছ ও সবজি-সহ পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। আগামী দিনে আরও ২১০টি নতুন কেন্দ্র চালু করার ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এর ফলে শহরের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
আদিবাসী উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বিশেষ প্রকল্পের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। লোধা শবর, টোকো এবং বিরহল—এই তিন আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য সাপ্তাহিক খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করা হবে। প্রতিটি পরিবারকে চাল, ডাল, চিনি ও তেল-সহ প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হবে।
পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একাধিক বড় প্রকল্পের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। কলকাতা বিমানবন্দরের পাশাপাশি কল্যাণীর কাছে দ্বিতীয় বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় নতুন উন্নয়ন প্রকল্প, রাস্তা, সেতু এবং জনপরিষেবা সম্প্রসারণের রূপরেখাও তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন, এই বাজেট শুধু আর্থিক হিসাবের খাতা নয়, বরং বাংলার অর্থনীতি পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, মহিলাদের ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক সুরক্ষাকে আরও শক্তিশালী করার একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা। প্রথম বাজেটেই একের পর এক বড় ঘোষণা করে বিজেপি সরকার আগামী দিনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিশা স্পষ্ট করে দিয়েছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
