29.5 C
Kolkata
June 22, 2026
রাজ্য

বাজেটে ‘বিকশিত বাংলা’র রূপরেখা তুলে ধরল বিজেপি সরকার

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

৩৮% ডিএ, ১ লক্ষ চাকরি, ৩৬ হাজার কোটি টাকার অন্নপূর্ণা যোজনা

সংবাদ কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করল বিজেপি সরকার। বিধানসভায় অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত চলতি অর্থবর্ষের বাকি আট মাসের জন্য ৬০ কোটি ৭০ লক্ষ টাকার ঘাটতি বাজেট পেশ করে দাবি করেছেন, এই বাজেটই আগামী দিনের ‘বিকশিত বাংলা’ গঠনের রূপরেখা তৈরি করবে। বিপুল ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়েও সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং সরকারি কর্মীদের আর্থিক স্বস্তিকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছে নতুন সরকার।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমান রাজ্য সরকারের হাতে এসেছে ৮ লক্ষ ১৫ হাজার ৮৯১ কোটি টাকার ঋণের ভার। সেই পরিস্থিতিতেও আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে উন্নয়ন এবং জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চালিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি, রাজস্ব ঘাটতি এবং আর্থিক ঘাটতি ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজ্যের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা হবে।

এই বাজেটের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে অন্নপূর্ণা যোজনা। এই প্রকল্পের জন্য ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, মহিলাদের আর্থিক স্বনির্ভরতা এবং পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই প্রকল্পকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মহিলা কলেজ পড়ুয়াদের জন্য এককালীন আর্থিক সহায়তা এবং সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাত্রার সুবিধার জন্যও পৃথক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের জন্যও বড় ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ১ অক্টোবর থেকে ২০ শতাংশ মহার্ঘভাতা বৃদ্ধি করা হবে। বর্তমানে প্রাপ্ত ডিএ-র সঙ্গে এই বৃদ্ধি যুক্ত হলে মোট ডিএ দাঁড়াবে ৩৮ শতাংশ। একই সুবিধা পাবেন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীরাও। দীর্ঘদিন ধরে ডিএ বৃদ্ধির দাবি তুলে আসা কর্মচারী মহলের কাছে এই ঘোষণা বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার। আগামী দিনে এক লক্ষ শূন্যপদে নিয়োগের ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০ হাজার পদ পুলিশ বিভাগে এবং ৫০ হাজার পদ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী হিসেবে পূরণ করা হবে। মোট নিয়োগের ৩৩ শতাংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। পাশাপাশি অগ্নিবীরদের জন্য নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ সংরক্ষণের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি চাকরিতে বয়সের ঊর্ধ্বসীমা শিথিল রাখার সিদ্ধান্তও বহাল থাকবে।

সমাজকল্যাণ খাতে একাধিক নতুন সুবিধার কথা বলা হয়েছে। বয়স্ক, বিধবা এবং বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের ভাতা মাসে ৫০০ টাকা বৃদ্ধি করা হবে। সিভিক ভলান্টিয়ার, গ্রিন পুলিশ, এনভিএফ কর্মী, প্রাণীবন্ধু এবং প্রাণীমিত্রদের মাসিক পারিশ্রমিক ২ হাজার টাকা করে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী এবং আশা কর্মীদের মাসিক ভাতা ৫ হাজার টাকা বৃদ্ধি করার ঘোষণাও বাজেটের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক।

পরিকাঠামো উন্নয়নেও বড়সড় পরিকল্পনা সামনে এনেছে সরকার। দুর্গাপুর-আসানসোল এবং শিলিগুড়ি অঞ্চলে মেট্রো পরিষেবার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হবে। পুরুলিয়া এবং মালদহে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। চিংড়িহাটা-নিউটাউন এলিভেটেড করিডরকে আসামের কাজিরাঙার ধাঁচে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া ১,২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে কলনা-শান্তিপুর সংযোগকারী ভাগীরথী সেতু, ময়ূরেশ্বর নদীর উপর চার লেনের সেতু, দানকুনি-মগরা করিডর-সহ একাধিক বৃহৎ প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গে আইআইটি এবং এইমস গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে সরকার।

শিক্ষা, কৃষি, স্বরাষ্ট্র এবং গ্রামোন্নয়ন খাতেও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কৃষি দপ্তরের জন্য ৮,৫৬৫ কোটির বেশি, খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তরের জন্য ৮,০৫৩ কোটি, উচ্চশিক্ষা খাতে ৭,১৬৮ কোটি এবং স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দপ্তরের জন্য ১৭,৯২৫ কোটিরও বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৫১,৮৩৬ কোটি টাকা।

বাজেটে প্রযুক্তি এবং শিল্পায়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর উন্নয়নের জন্য ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ইমপ্যাক্ট এআই মিশন’ চালুর ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি শিল্প বিনিয়োগ বৃদ্ধি, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির উপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, দুর্নীতিমুক্ত এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। সেই উদ্দেশ্যে নাগরিক পরিষেবা আরও সহজ এবং স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ‘অপনার সরকার অপনার পাশে’ নামে একটি হেল্পলাইন পরিষেবাও চালু করা হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট একদিকে জনমুখী প্রতিশ্রুতিতে ভরপুর, অন্যদিকে বিপুল ঋণের ভার এবং আর্থিক সংস্থানের প্রশ্নও সামনে রেখে দিয়েছে। ফলে আগামী দিনে ঘোষিত প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন এবং অর্থের জোগান কীভাবে নিশ্চিত করা হয়, তার উপরই অনেকটা নির্ভর করবে এই বাজেটের সাফল্য।

Related posts

Leave a Comment