হামিম মণ্ডল এবং তাঁর বান্ধবী অর্পিতা সরকারকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে বলে দাবি করল রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)। তদন্তকারীদের দাবি, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর গতিবিধির উপর নজরদারি চালিয়ে তাঁর নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল। সেই তথ্য নির্দিষ্ট যোগাযোগকারীদের মাধ্যমে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের কাছে পৌঁছে দেওয়া হত কি না, তা এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এসটিএফ স্পষ্ট করেছে, এই অভিযোগগুলির তদন্ত এখনও চলছে এবং সব দিক যাচাই করা হচ্ছে।
শনিবার সাংবাদিক বৈঠকে এসটিএফের আইজি গৌরব শর্মা জানান, প্রাথমিক তদন্তে হামিম মণ্ডলের সঙ্গে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদের যোগাযোগের সূত্র মিলেছে বলে তদন্তকারীদের অনুমান। তাঁর দাবি, হামিমের অন্যতম দায়িত্ব ছিল মুখ্যমন্ত্রীর সফরসূচি, অবস্থান এবং কোথাও নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে কি না, সেই সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা। সেই তথ্য নির্দিষ্ট হ্যান্ডলারদের মাধ্যমে পাঠানো হত বলে তদন্তে উঠে এসেছে। আইজি আরও জানান, হামিমকে গ্রেপ্তারের আগেই কয়েকজন পাকিস্তানি হ্যান্ডলারের বিষয়ে তথ্য পেয়েছিল এসটিএফ। সেই সূত্র ধরেই অভিযান চালানো হয়।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, দিল্লির যন্তর মন্তরে ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করেও নাশকতার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এসটিএফের দাবি, সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পুলিশের পোশাক সংগ্রহের চেষ্টারও তথ্য মিলেছে। তবে হামিম যন্তর মন্তরে গিয়েছিলেন কি না অথবা তিনি পুলিশের পোশাক সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। বিষয়টি তদন্তাধীন বলেই জানিয়েছে এসটিএফ।
তদন্তকারীদের দাবি, হামিমের সঙ্গে পাকিস্তানের সরাসরি যোগাযোগ ছিল না। কয়েকজন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে নির্দেশ আদানপ্রদান করা হত। ওই যোগাযোগকারীদের পিছনে পাকিস্তানের শাহজাদ ভাট্টি গোষ্ঠীর ভূমিকা ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হামিমের সঙ্গে এই নেটওয়ার্কের সম্পর্ক কত দিনের এবং কীভাবে যোগাযোগ বজায় রাখা হত, সেই বিষয়েও তদন্ত চলছে।
অর্পিতা সরকারকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এসটিএফের দাবি, অর্পিতা জঙ্গি নেটওয়ার্কের হয়ে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতেন। তাঁর একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা রয়েছে এবং তিনি পেশায় ফটোগ্রাফার। এই পেশার সূত্রে তিনি বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ মহলে সহজেই পৌঁছতে পারতেন বলে তদন্তকারীদের ধারণা। সেই সম্ভাব্য যোগাযোগগুলিও এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এসটিএফ সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, অর্পিতা তাঁর আইফোন ১৬ প্রো-তে ‘এলিমেন্ট এক্স’ নামে একটি সুরক্ষিত বার্তা আদানপ্রদানের অ্যাপ ব্যবহার করতেন। ওই অ্যাপের মাধ্যমে কার সঙ্গে কী ধরনের তথ্য আদানপ্রদান করা হয়েছে, তা ফরেন্সিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরীক্ষা করছেন তদন্তকারীরা। পাশাপাশি তাঁর মোবাইল ফোন থেকে উদ্ধার হওয়া তথ্যও বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আইজি গৌরব শর্মা আরও জানান, কয়েক দিন আগে হাওড়ার এক প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং তাঁর ছেলেকে ‘হানিট্র্যাপ’-এর মাধ্যমে অপহরণের পরিকল্পনার খবর পেয়েছিল এসটিএফ। সেই সূত্র ধরেই সাহেবগঞ্জের একটি সমাজমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট তদন্তকারীদের নজরে আসে, যা অর্পিতা সরকারের বলে দাবি করা হয়েছে। সেই সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় তাঁকে।
প্রসঙ্গত, গত ২৯ জুলাই পূর্ব বর্ধমানের একটি শরীরচর্চা কেন্দ্র থেকে হামিম মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করে এসটিএফ। তাঁকে জেরা করে ‘রানা’, ‘আবিদ জাট৩৩৩’, ‘হামাদ’ এবং ‘উজায়ের’ নামে কয়েকজনের তথ্য পাওয়া গিয়েছে বলে তদন্তকারীদের দাবি। সমাজমাধ্যম এবং এনক্রিপ্টেড বার্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হত কি না, তা-ও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীদের দাবি, হামিমকে দীর্ঘদিন ধরে মৌলবাদী মতাদর্শে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলেছিল। পাশাপাশি এই চক্রের আর্থিক উৎস, বিদেশ থেকে অর্থ লেনদেন এবং আরও কারা এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সেই সব দিকও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে হামিম মণ্ডল এবং অর্পিতা সরকারকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করার জন্য আদালতের অনুমতি চাওয়া হয়। আদালত অর্পিতাকে ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে।
