31.3 C
Kolkata
June 8, 2026
রাজ্য

মদ-বিতরণ নীতির আড়ালে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি? ‘গোপন রিপোর্ট’ ঘিরে চাঞ্চল্য, বাংলার রাজনীতিতে নতুন ঝড়

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

কলকাতা: দিল্লির আবগারি কেলেঙ্কারি নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে বিতর্ক এখনও থামেনি। তারই মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মদ-বিতরণ নীতি নিয়ে সামনে এল একাধিক বিস্ফোরক অভিযোগ। দেশের অন্যতম প্রাচীন ইংরেজি সংবাদপত্র ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০১৭ সালে রাজ্যের মদ-বিতরণ ব্যবস্থায় আনা পরিবর্তনের আড়ালে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্য আবগারি দপ্তরের একটি গোপন তদন্ত রিপোর্টে এই অভিযোগগুলির উল্লেখ রয়েছে। যদিও রিপোর্টটি এখনও সর্বসমক্ষে প্রকাশিত হয়নি এবং অভিযোগগুলির সরকারি পর্যায়ে স্বাধীন যাচাইও সম্পূর্ণ হয়নি।

কার্টেল ভাঙার নামে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ?
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০১৭ সালে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট বেভারেজেস কর্পোরেশন লিমিটেড’ বা ডব্লিউবিএসবিসিএল গঠনের সময় সরকারের তরফে বলা হয়েছিল, এর ফলে মদ সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আসবে, কার্টেলাইজেশন বন্ধ হবে এবং রাজ্যের সর্বত্র সমানভাবে পণ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

তার আগে পর্যন্ত প্রায় ৫৫টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি পাইকারি সংস্থা স্বাধীনভাবে মদ বিতরণের কাজ করত। প্রস্তুতকারক এবং খুচরো বিক্রেতারাও নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহকারী বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু নতুন নীতি কার্যকর হওয়ার পরে সেই প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে কার্যত একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

প্রতি ক্রেটে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ
‘দ্য স্টেটসম্যান’-এর প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু ডিস্ট্রিবিউটরের মাধ্যমে মদ প্রস্তুতকারী এবং বোতলজাতকারী সংস্থাগুলির উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা হত।

গোপন রিপোর্টের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, গুদাম ভাড়া বাবদ প্রতি ক্রেটে ৪ টাকা এবং পরিবহণ খাতে আরও ৩ টাকা করে অতিরিক্ত আদায় করা হত। অভিযোগ, এই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না পড়ে অন্যত্র চলে যেত। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা এখনও সরকারি ভাবে প্রমাণিত হয়নি।

রাজনৈতিক যোগ নিয়ে প্রশ্ন
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, এই আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের নামও উঠে এসেছে। সেই সূত্রেই তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

তবে সংবাদপত্রটির বক্তব্য অনুযায়ী, এই অভিযোগ সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানার জন্য যোগাযোগ করা হলেও তাঁর তরফে কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রকাশ্যে এই অভিযোগ নিয়ে এখনও কোনও মন্তব্য করেননি।

আইএফবি অ্যাগ্রোর চিঠি ঘিরে নতুন প্রশ্ন
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আইএফবি অ্যাগ্রো গত ১৮ মে রাজ্যের আবগারি কমিশনার এবং মুখ্যসচিবের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে বেআইনি আর্থিক চাপের অভিযোগ তোলে। সংস্থার দাবি, অতিরিক্ত অর্থ প্রদানে আপত্তি জানানোয় তাদের ব্যবসায়িক কার্যকলাপে প্রশাসনিক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে।

এই অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। যদিও রাজ্য সরকারের তরফে এ বিষয়ে এখনও বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া প্রকাশ্যে আসেনি।

উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখার দাবি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন মদ-বিতরণ নীতির খসড়া তৈরির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন প্রাক্তন ও বর্তমান উচ্চপদস্থ আধিকারিকের ভূমিকাও গোপন রিপোর্টে খতিয়ে দেখা হয়েছে। তবে তাঁদের অধিকাংশের কাছ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

বর্তমান আবগারি কমিশনার কৌশিক ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করার অনুমতি পাননি। অন্যদিকে প্রাক্তন আবগারি কমিশনার উমাশঙ্কর এস বলেছেন, এটি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল এবং ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কিছু বলার নেই।

তদন্তের দাবিতে জোর
গোপন রিপোর্টে আরও দাবি করা হয়েছে, পুরনো ব্যবস্থায় উৎপাদন কেন্দ্রেই আবগারি শুল্ক আদায় করা হত, যা রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর ছিল। নতুন ব্যবস্থায় দুই ধাপে শুল্ক আদায়ের ফলে রাজস্ব আদায়ে বিলম্ব এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

এরই মধ্যে একাধিক মদ প্রস্তুতকারী এবং বোতলজাতকারী সংস্থা নাকি বেআইনিভাবে আদায় করা অর্থ ফেরত এবং ক্ষতিপূরণের দাবিতে সরকারের দ্বারস্থ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।

তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এ প্রকাশিত এই সমস্ত তথ্য ও অভিযোগ এখনও তদন্তসাপেক্ষ। সরকারি তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগগুলি প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলিকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হবে। তা সত্ত্বেও এই প্রতিবেদন রাজ্যের রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

Related posts

Leave a Comment