কাঠমান্ডু, ২৬ আগস্ট: তিব্বত সীমান্তবর্তী নেপালের রাশুয়া জেলায় (Rasuwa) ভোতে কোশি নদীতে (Bhotekoshi River) আচমকা জলস্ফীতির জেরে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। প্রবল জলস্রোতে একের পর এক বসতি, রাস্তা, সেতু এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন সর্বশেষ প্রতিবেদনে অন্তত ১৫৭টি দেহ উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকাজ চলছে এবং মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা এখনও যাচাই করা হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে কৈলাস মানস সরোবর যাত্রার (Kailash Mansarovar Yatra) পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের নিয়ে। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের (Nepal Tourism Board) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, রাশুয়া এলাকায় ৩৮৪ জন যাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাঁদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি এবং ৯৩ জন নেপালি নাগরিক। তালিকায় ১০৫ জন ভারতীয় এবং ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয়ের নাম রয়েছে।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, এই তালিকা এখনও প্রাথমিক। বিভিন্ন পর্যটন সংস্থা ও ভ্রমণ সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ফলে তালিকায় থাকা প্রত্যেক ব্যক্তি নিখোঁজ বা মৃত—এমন সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে তাঁদের অবস্থান যাচাইয়ের কাজ চলছে।
ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত তিব্বত সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায়। প্রাথমিক উপগ্রহ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সীমান্তের কাছে পাহাড়ের একটি অস্থিতিশীল অংশে ধস নামার পর বরফ ও পাথরের বিশাল স্তূপ নদীর গতিপথে প্রভাব ফেলে এবং আচমকা জলস্রোত তৈরি হয়। সেই জল ভোতে কোশি নদী হয়ে নেপালের দিকে নেমে আসে। নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া দপ্তরের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, রাশুয়া এলাকায় এই বন্যার মূল কারণ বৃষ্টিপাত ছিল না।
রাশুয়ার তিমুরে (Timure) এবং স্যাফ্রুবেশি (Syapru Besi) এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নদীর প্রবল স্রোতে সেতু ও রাস্তার অংশ ভেসে যাওয়ায় বহু এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বাজার এলাকা, নিরাপত্তা চৌকি, বাড়িঘর এবং যানবাহনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন পরিকাঠামোর উপরও বিপর্যয়ের প্রভাব পড়েছে।
নেপাল সেনা (Nepal Army), নেপাল পুলিশ (Nepal Police), সশস্ত্র পুলিশ এবং বিপর্যয় মোকাবিলা সংস্থাগুলি উদ্ধারকাজে নেমেছে। দুর্গম এলাকায় আটকে থাকা মানুষকে উদ্ধারে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু খারাপ আবহাওয়া এবং পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে সব এলাকায় পৌঁছনো সম্ভব হচ্ছে না। উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারগুলিকেও আবহাওয়ার কারণে একাধিকবার ফিরে আসতে হয়েছে।
নেপাল সেনার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বহু মানুষকে ইতিমধ্যে উদ্ধার করে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আহতদের স্থানীয় শিবির ও কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। নেপাল সরকারের তরফেও আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে জরুরি আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করার কথা জানানো হয়েছে।
বিপর্যয়ের ভয়াবহতা এতটাই বেশি যে নেপাল সরকার দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে। উদ্ধার, চিকিৎসা, ত্রাণ এবং নিখোঁজদের সন্ধানে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরকে একযোগে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভারতীয় নাগরিকদের উদ্ধারের বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় দূতাবাস (Embassy of India, Kathmandu) নেপাল সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে। ভারতীয় নাগরিকদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য দূতাবাস জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থাও করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) নেপালের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে মানবিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
নেপালের দূতাবাস (Embassy of Nepal in India) জানিয়েছে, পরিস্থিতি এখনও পরিবর্তনশীল। মৃত, নিখোঁজ এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব যাচাই করা হচ্ছে। বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ সম্পর্কেও বিস্তারিত মূল্যায়ন চলছে। ফলে পরবর্তী সময়ে হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা বদলে যেতে পারে।
এই বিপর্যয়ের প্রভাব নেপালের সীমান্তবর্তী এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। নদীর জলপ্রবাহ এবং পরবর্তী বন্যার আশঙ্কায় নেপালের নীচের দিকের এলাকাগুলির পাশাপাশি ভারতের বিহার ও উত্তরপ্রদেশেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিখোঁজ যাত্রীদের সন্ধান এবং দুর্গম এলাকায় আটকে থাকা মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে আনা। বিশেষ করে কৈলাস মানস সরোবর যাত্রায় যাওয়া ভারতীয়-সহ বিদেশি পর্যটকদের অবস্থান নিশ্চিত করতে ভ্রমণ সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হয়েছে।
প্রবল জলস্রোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেক জায়গায় সরাসরি পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে উদ্ধারকারী দলকে নদী, পাহাড়ি ধস এবং ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তার মধ্যে দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূল হলে উদ্ধারকাজ আরও দ্রুত করা সম্ভব হবে বলে প্রশাসনের আশা।
এই মুহূর্তে সরকারি সংস্থাগুলির প্রধান আবেদন, প্রাথমিক নিখোঁজের তালিকা দেখে কোনও পরিবার যেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না পৌঁছয়। তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের অবস্থান যাচাইয়ের কাজ চলছে। উদ্ধারকারী দল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার পরই তাঁদের প্রকৃত অবস্থার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
