August 26, 2026
কলকাতা

নেপালের হড়পা বানে নিখোঁজ কলকাতার ৩২ পর্যটক

নবান্নের হেল্পলাইন চালু

সংবাদ কলকাতা: নেপালের রসুয়া জেলায় ভয়াবহ হড়পা বানের জেরে উদ্বেগ বাড়ল বাংলার বাসিন্দাদের নিয়ে। নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যার পর ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে যাওয়া কলকাতার ৩২ জন পর্যটকের এখনও কোনও খোঁজ মেলেনি বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে। বুধবার সকালে তাঁদের নেপাল-তিব্বত সীমান্ত পার হওয়ার কথা ছিল। এই পরিস্থিতিতে নিখোঁজ পর্যটকদের পরিজনদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার জন্য হেল্পলাইন চালু করেছে নবান্ন।

বাংলার বাসিন্দাদের সহযোগিতায় দুটি হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে। নম্বরগুলি হল (০৩৩) ২৪৭৯-৩৩১১ এবং ৯১৪৭৮৯০১৮১। নেপালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি অথবা তাঁদের পরিবারের সদস্যরা এই নম্বরগুলিতে যোগাযোগ করতে পারবেন। নিখোঁজ পর্যটকদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং তাঁদের পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনিক সমন্বয়ের কাজেও এই হেল্পলাইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কার্যত বিপর্যস্ত নেপালের সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা। বুধবার সকাল থেকে আচমকা নদীর জলস্তর বাড়তে শুরু করে। এরপরই চিন সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলায় ভয়াবহ হড়পা বান নামে। প্রবল জলস্রোতে রাস্তা, সেতু, বসতবাড়ি, বাজার এলাকা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বহু এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে।

নেপাল পর্যটন বোর্ডের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বন্যাদুর্গত এলাকা থেকে মোট ৩৮৪ জন পর্যটক ও যাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাঁদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি এবং ৯৩ জন নেপালি নাগরিক। বিদেশিদের মধ্যে অন্তত ১০৫ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন বলে জানিয়েছে নেপাল পর্যটন বোর্ড। ফলে ভারতীয় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

নিখোঁজদের মধ্যে কৈলাস মানস সরোবর যাত্রায় যাওয়া পর্যটকরাও রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। বিভিন্ন ভ্রমণ সংস্থার মাধ্যমে যাওয়া পর্যটকদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। তবে এই তালিকাকে এখনও চূড়ান্ত নিখোঁজের তালিকা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। ভ্রমণ সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পর্যটকদের অবস্থান যাচাই করা হচ্ছে।

পরিস্থিতির আরও একটি উদ্বেগজনক দিক হল নেপালের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নিখোঁজ হওয়ার খবর। রসুয়া জেলায় নেপাল পুলিশের অন্তত ২৬ জন আধিকারিকের এখনও হদিশ পাওয়া যায়নি বলে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি নেপালের আধাসেনার অন্তত সাত জন জওয়ানেরও খোঁজ মিলছে না। ফলে উদ্ধারকাজে প্রশাসনের উপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

এদিকে নদী তীরবর্তী এলাকাগুলিতে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নেপাল প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছে। মুগলিন-সহ নদী সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকার মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নদীর জলস্তরের পরিবর্তনের উপর লাগাতার নজর রাখা হচ্ছে।

এই বিপর্যয়ের কারণ নিয়েও শুরু হয়েছে অনুসন্ধান। হিমবাহের জলাধার ভেঙে আচমকা জল নেমে আসার ঘটনা, অর্থাৎ ‘হিমবাহ-হ্রদ ভাঙনজনিত হড়পা বান’-এর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে নেপালের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে রসুয়া এলাকায় অতিরিক্ত ভারী বৃষ্টির কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে, এমন সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে তিব্বত থেকে আচমকা বিপুল জল নেমে আসার সম্ভাবনাও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

চিনের সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, হড়পা বানের প্রভাব তিব্বতের গাইরং প্রদেশ-সহ সীমান্তবর্তী বেশ কিছু এলাকাতেও পড়েছে। সেখানেও হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বিপর্যয়ের উৎস এবং জলপ্রবাহের গতিপথ নিয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।

নেপাল প্রশাসন ইতিমধ্যেই উদ্ধার ও ত্রাণকাজে নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিপর্যয় মোকাবিলা সংস্থাগুলিকে নামিয়েছে। দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বহু জায়গায় পৌঁছতে সমস্যা হচ্ছে। নিখোঁজ পর্যটকদের অবস্থান শনাক্ত করাই এখন অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

প্রতিবেশী দেশে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের সঙ্গে ফোনে কথা বলে তিনি সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন। ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং উদ্ধারকাজের বিষয়েও দুই দেশের প্রশাসনের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে।

বাংলার ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ কলকাতা থেকে যাওয়া ৩২ জন পর্যটককে নিয়ে। তাঁদের পরিবারের সদস্যরা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। নবান্নের চালু করা হেল্পলাইনের মাধ্যমে নিখোঁজদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ, পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনের যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে।

প্রশাসনের তরফে পরিবারের সদস্যদের কাছে আবেদন, যাচাই না হওয়া কোনও তথ্যের ভিত্তিতে আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য। নেপাল প্রশাসন ও ভ্রমণ সংস্থাগুলির কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই নিখোঁজ পর্যটকদের অবস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নদী তীরবর্তী এবং বিপর্যয়প্রবণ এলাকায় সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

Related posts

Leave a Comment