August 26, 2026
রাজ্য

মমতার জমানায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন

সরকারি বিজ্ঞাপন থেকে নন্দীগ্রাম-ড্রামা এবার আসুক প্রকাশ্যে

সুভাষ পাল

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ শাসনকালে পশ্চিমবঙ্গে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টন এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা ফের সামনে এসেছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের অভিযোগ, সরকারের সমালোচনামূলক খবর প্রকাশ করা সংবাদমাধ্যমকে বিভিন্ন সময়ে সরকারি বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে বঞ্চনার মুখে পড়তে হয়েছে। অন্যদিকে, সরকারের প্রতি তুলনামূলকভাবে সহানুভূতিশীল সংবাদমাধ্যমগুলি সরকারি বিজ্ঞাপনের সুবিধা পেয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারলে সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের কাজকর্মের পূর্ণাঙ্গ ছবি পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়ে। দুর্নীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা রাজনৈতিক অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলার জায়গা দুর্বল হলে তার প্রভাব পড়তে পারে জনমত তৈরিতেও। মমতা সরকারের আমলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে।

তবে এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সরকারি নথিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোন সংবাদমাধ্যম কত টাকা সরকারি বিজ্ঞাপন পেয়েছে, কোন সময়ে পেয়েছে এবং একই সময়ে সরকারের সমালোচনামূলক অবস্থানে থাকা সংবাদমাধ্যমগুলি কী পরিমাণ বিজ্ঞাপন পেয়েছে, সেই তথ্য প্রকাশ্যে এলে অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে।

সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টন নিয়ে বিতর্ক অবশ্য মমতা সরকারের আমলে নতুন কোনও বিষয় ছিল না। ২০১৫ সালে গণশক্তি সংবাদপত্রকে সরকারি বিজ্ঞাপন দেওয়ার বিষয়টি কলকাতা হাইকোর্টে ওঠে। রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে একটি সংবাদপত্রকে সরকারি বিজ্ঞাপন থেকে বঞ্চিত করা যায় কি না, সেই প্রশ্ন আদালতের সামনে আসে। আদালতের পর্যবেক্ষণে রাজনৈতিক কারণে সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ রাখার বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছিল।

২০১৮ সালেও সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টন নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে বিষয়টি ওঠে। আদালত রাজ্য সরকারের কাছে ২০১১ সালের মে মাস থেকে ২০১৮ সালের জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সরকারি বিজ্ঞাপনের হিসাব চেয়েছিল। ফলে সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন যে দীর্ঘদিনের, তার নথিভুক্ত নজির রয়েছে।

২০১৪ সালেও ইন্ডিয়ান নিউজপেপার সোসাইটি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দেওয়া বিজ্ঞাপনের বিল সময়মতো মেটানো নিয়ে অভিযোগ তুলেছিল। সংবাদপত্রগুলিকে বিজ্ঞাপনের টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে দেরি হওয়া নিয়ে সংগঠনটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। অর্থাৎ বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত সমস্যা শুধু রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, সংবাদপত্রগুলির আর্থিক স্বার্থের সঙ্গেও বিষয়টি যুক্ত ছিল।

২০২১ সালে সরকারি বিজ্ঞাপন এবং সংবাদ প্রকাশের সম্পর্ক নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের উল্লেখ করে দাবি করা হয়েছিল, সরকারের ইতিবাচক খবর বেশি প্রকাশ করলে সংবাদপত্রগুলি বেশি বিজ্ঞাপন পেতে পারে। রাজনৈতিক মহলের একাংশ এই বক্তব্যকে সংবাদমাধ্যমের উপর সরকারি প্রভাব তৈরির ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছিল। যদিও কোনও নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যমকে রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে সরকারি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল কি না, তা প্রমাণ করতে নির্দিষ্ট সরকারি নথি প্রয়োজন।

এই বিতর্কের সঙ্গে ২০২১ সালের নন্দীগ্রাম-কাণ্ডও ফের আলোচনায় এসেছে। বিধানসভা নির্বাচনের আগে নন্দীগ্রামে প্রচারে গিয়ে আহত হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল, কয়েকজন তাঁকে ধাক্কা দিয়েছিল এবং ঘটনার পিছনে ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। ঘটনার পর তাঁকে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের রিপোর্টে বাঁ পায়ের গোড়ালি ও পায়ে চোটের উল্লেখ ছিল।

ঘটনার পর তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এটিকে হামলা ও ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক মহলের পক্ষ থেকে সেই অভিযোগ অস্বীকার করে ঘটনাটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা বলে পাল্টা দাবি করা হয়েছিল। ফলে নন্দীগ্রামের ঘটনা দ্রুত বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়।

তবে নন্দীগ্রাম-কাণ্ডে পরবর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষকদের রিপোর্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ পর্যবেক্ষক অজয় নায়েক এবং বিশেষ পুলিশ পর্যবেক্ষক বিবেক দুবের রিপোর্টে ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হামলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাঁদের পর্যবেক্ষণে ঘটনাটি আকস্মিকভাবে ঘটেছিল বলে উল্লেখ করা হয়।

নির্বাচন কমিশন ওই ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিবের কাছেও বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়েছিল। নন্দীগ্রাম থানায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। ফলে ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি প্রশাসনিক তদন্তের প্রক্রিয়াও হয়েছিল।

এখানেই রাজনৈতিক মহলের একাংশের প্রশ্ন, নন্দীগ্রামের ঘটনার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আহত অবস্থার ছবি এবং রাজনৈতিক বক্তব্য যেভাবে প্রচারিত হয়েছিল, তাতে নির্বাচনী প্রচারে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে সহানুভূতির পরিবেশ তৈরি হয়েছিল কি না। বিরোধী রাজনৈতিক মহলের দাবি, ঘটনাটিকে ঘিরে তৈরি আবেগ নির্বাচনী প্রচারে তৃণমূলকে রাজনৈতিক সুবিধা দিয়েছিল।

সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও একইভাবে অভিযোগ ও তথ্যকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। রাজনৈতিক মহলের একাংশের অভিযোগ, মমতা সরকারের সময় কিছু সংবাদমাধ্যম সরকারের বক্তব্যকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছে এবং সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। তাঁদের আরও দাবি, সরকারি বিজ্ঞাপনের উপর আর্থিক নির্ভরতা সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় স্বাধীনতার উপর পরোক্ষ চাপ তৈরি করতে পারে।

এই অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য সংবাদমাধ্যমভিত্তিক সরকারি বিজ্ঞাপনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ও পরে কোন সংবাদমাধ্যম কত সরকারি বিজ্ঞাপন পেয়েছিল, বিজ্ঞাপন বণ্টনের ক্ষেত্রে কী নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল এবং কোনও সংবাদমাধ্যমকে রাজনৈতিক কারণে বঞ্চিত করা হয়েছিল কি না—এই তথ্য সামনে এলে বিতর্কের অনেকটাই অবসান হতে পারে।

রাজনৈতিক মহলের আরও বক্তব্য, সংবাদমাধ্যমকে কোনও সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে পরিচালিত করার চেষ্টা গণতন্ত্রের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়। সরকার যে দলেরই হোক, সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব হল সরকারের কাজের হিসাব চাওয়া এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলি সামনে আনা। একইসঙ্গে সংবাদমাধ্যমেরও দায়িত্ব রাজনৈতিক বক্তব্য যাচাই না করে প্রচার না করা।

তবে মমতা সরকারের আমলে সংবাদমাধ্যমের উপর ‘সবচেয়ে বেশি দমননীতি’ চালানো হয়েছিল—এই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করতে দীর্ঘ সময়ের সরকারি তথ্য, বিজ্ঞাপনের হিসাব, আদালতের নথি এবং সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত খবর একসঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তবে সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টন নিয়ে একাধিক সময়ে আদালতে প্রশ্ন ওঠা এবং নন্দীগ্রাম-কাণ্ডে রাজনৈতিক বক্তব্য ও নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষণের মধ্যে পার্থক্য থাকা—দুটি বিষয়ই বিতর্কটিকে নতুন করে আলোচনার জায়গায় নিয়ে এসেছে।

এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক অভিযোগের বাইরে গিয়ে সমস্ত সরকারি নথি প্রকাশ্যে আনা। কোন সংবাদমাধ্যম কী পরিমাণ সরকারি সুবিধা পেয়েছে, বিজ্ঞাপন বণ্টনে কোনও পক্ষপাত ছিল কি না এবং নির্বাচনের সময় কোনও ঘটনাকে রাজনৈতিক প্রচারে অতিরঞ্জিত করা হয়েছিল কি না—প্রমাণের ভিত্তিতে সেই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজাই হতে পারে পরবর্তী পদক্ষেপ।

গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভকে শক্তিশালী করতে হলে সরকারের জবাবদিহির পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং তথ্যের নির্ভুলতাও নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিনের এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে অভিযোগের পাল্টা অভিযোগ নয়, বরং সরকারি নথি, আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং স্বাধীন তদন্তের ভিত্তিতেই সত্য সামনে আনা প্রয়োজন।

Related posts

Leave a Comment