অবতরণের অনুমতি না দিলে অন্য পরিস্থিতি তৈরি হত
ঢাকা: শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরানোর বিষয়ে এখনই কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানালেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। তাঁর বক্তব্য, হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ ভারতীয় আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে এবং বিষয়টির সঙ্গে আদালত-সহ একাধিক আইনি দিক জড়িত। পাশাপাশি ২০২৪ সালের অগস্টে হাসিনাকে ভারতে ঢোকার অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।
শনিবার ঢাকায় আয়োজিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর একটি কর্ম অধিবেশনে শেখ হাসিনাকে নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন দীনেশ। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে হাসিনাকে ফেরানোর দাবি জানানো হচ্ছে। সেই প্রসঙ্গে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ভারত সরকার বার বার জানিয়েছে যে প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া আইনি এবং সুসংগঠিত। ফলে পুরো প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো সম্ভব নয়।
দীনেশের বক্তব্য, ‘এটির একটি প্রক্রিয়া আছে। এটির একটি নির্দিষ্ট কাঠামো আছে। সেই প্রক্রিয়া চলছে। আইনি বিষয়ও এর সঙ্গে যুক্ত।’ তিনি আরও বলেন, ভারতের বিচারব্যবস্থা তার নিজস্ব নিয়ম মেনে কাজ করছে এবং বাংলাদেশের অনুরোধও সেই প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ার মধ্যেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
হাসিনাকে ২০২৪ সালের ৫ অগস্ট বাংলাদেশ থেকে ভারতে নিয়ে আসার বিষয়েও এ দিন গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন দীনেশ। তিনি জানান, ভারতীয় বায়ুসেনা বা সেনাবাহিনী তাঁকে ভারতে নিয়ে আসেনি। বাংলাদেশের সামরিক বিমানেই তিনি ভারতে এসেছিলেন। সেই সময় পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং ভারতও এমন পরিস্থিতির জন্য আগে থেকে প্রস্তুত ছিল না বলে জানান তিনি।
দীনেশ বলেন, ‘হাসিনাজিকে ভারতীয় বায়ুসেনা বা ভারতের সেনাবাহিনী নিয়ে আসেনি। বাংলাদেশের সামরিক বিমানে তাঁকে ভারতে নিয়ে আসা হয়েছিল।’ তাঁর আরও বক্তব্য, ‘তিনি যখন ঢাকা ছাড়েন, তখন তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ভারত এই পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল না।’
ভারতে অবতরণের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে দীনেশ বলেন, ‘আমরা যদি তাঁকে অবতরণের অনুমতি না দিতাম, তা হলে একেবারে অন্য রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো।’ অর্থাৎ, তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেই মুহূর্তে বিমানটিকে ভারতে নামার অনুমতি দেওয়াই বাস্তব পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে থাকা পথ ছিল।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু হওয়ার পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। ৫ অগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন এবং ভারতে চলে আসেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে আইনি পদক্ষেপ হয় এবং তাঁকে ফেরত চেয়ে ভারতকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধও জানায় ঢাকা। ভারত জানিয়েছে, সেই অনুরোধ আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
হাসিনাকে ফেরানোর দাবি নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কেও টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সময়েও বলা হয়েছে, হাসিনা-সহ ভারতে থাকা কয়েক জনকে ফেরত পাওয়া দুই দেশের সম্পর্ক উন্নত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অন্য দিকে ভারতীয় পক্ষ বার বার প্রত্যর্পণের বিষয়টিকে আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বলে জানিয়েছে।
শনিবারের আলোচনায় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়েও বার্তা দেন দীনেশ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ এবং কোন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে, সেই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের। অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করাই প্রকৃত প্রতিবেশীর দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশের দাবি থাকলেও আপাতত ভারতের অবস্থানে কোনও তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মেলেনি। দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে স্পষ্ট, বিষয়টি এখনও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে চাইছে না ভারত।
