29 C
Kolkata
October 24, 2026
রাজ্য

পিতলের লক্ষ্মীতে ঝোঁক, চিন্তায় মৃৎশিল্পীরা

নিজস্ব সংবাদদাতা, নদিয়া— দাম কিছুটা বেশি হলেও একবার কিনলেই বছরের পর বছর নিশ্চিন্ত। প্রতি বছর নতুন করে প্রতিমা কেনার ঝক্কি নেই, নেই রক্ষণাবেক্ষণের বাড়তি চিন্তাও। এই সুবিধার কারণেই কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আগে পিতলের লক্ষ্মীমূর্তির চাহিদা বাড়ছে। আর তাতেই উদ্বেগ বাড়ছে কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পী, শোলা ও বাঁশের প্রতিমা নির্মাতাদের মধ্যে। বিশেষ করে ছোট লক্ষ্মীমূর্তির বাজারে পিতলের বিগ্রহের জনপ্রিয়তা নতুন করে চাপ তৈরি করেছে মাটির প্রতিমা শিল্পের উপর।

কৃষ্ণনগরের নতুন বাজারে কাঁসা-পিতলের একাধিক দোকানে গত দু’মাসে লক্ষ্মীমূর্তি কেনার ভিড় বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, অনেকেই দুর্গাপুজোর কেনাকাটার সময়ই পিতলের লক্ষ্মীমূর্তি কিনে রেখেছেন। কেউ কেউ আবার মূর্তি কিনে শিল্পীদের কাছে অঙ্গরাগ করানোর জন্য দিয়ে গিয়েছেন, যাতে লক্ষ্মীপুজোর আগে তা হাতে পেতে অসুবিধা না হয়। অনেকে অবশ্য সাজসজ্জা সম্পন্ন মূর্তি সরাসরি বাড়িতেও নিয়ে গিয়েছেন।

বিক্রেতাদের কথায়, ১০০ গ্রাম থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত ওজনের পিতলের লক্ষ্মীমূর্তি সাধারণত পাওয়া যায়। এর চেয়ে ছোট বা বড় মূর্তি চাইলে আলাদা করে অর্ডার দিতে হয়। মূর্তির কারুকাজ যত সূক্ষ্ম ও নিখুঁত হয়, দামও তত বাড়ে। একবার কেনার পর দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায় বলেই ক্রেতাদের একাংশের কাছে পিতলের মূর্তি এখন পছন্দের বিকল্প হয়ে উঠছে।



কৃষ্ণনগরের পাত্রবাজারের বাসিন্দা প্রমিলা ভট্টাচার্য বলেন, মাটির প্রতিমা বাড়িতে আনা এবং সারা বছর যত্ন করে রাখা বেশ ঝুঁকির। অনেক বাড়িতে লক্ষ্মীপুজোর প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয় না। ফলে প্রতিমা সংরক্ষণের সমস্যা থেকেই যায়। সেই তুলনায় ধাতব মূর্তি ঘরে রাখা অনেক সহজ। তাই এ বছর মাটির প্রতিমার বদলে পিতলের লক্ষ্মীমূর্তি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

চাহিদা বাড়ায় ব্যস্ততা বেড়েছে ধাতব মূর্তির অঙ্গরাগ শিল্পীদেরও। কৃষ্ণনগরের সুবর্ণবিহারের অঙ্গরাগ শিল্পী সুমন দাস জানান, এ বছর লক্ষ্মীমূর্তির অঙ্গরাগের কাজ অনেকটাই বেড়েছে। বিজয়া দশমীর পর থেকেই নতুন বরাত নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি। হাতে থাকা কাজগুলি সময়মতো ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এখন তাঁর প্রধান লক্ষ্য।

তবে পিতলের মূর্তির এই জনপ্রিয়তা মৃৎশিল্পীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। লক্ষ্মীপুজোয় মাটির সরা, মাটির প্রতিমা এবং শোলার তৈরি দেবীমূর্তি ব্যবহারের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে। বহু পরিবার আজও সেই রীতি মেনে পুজো করে। কিন্তু ছোট আকারের লক্ষ্মীমূর্তির ক্ষেত্রে পিতলের বিগ্রহের প্রতি আকর্ষণ বাড়ায় মাটির মূর্তির চাহিদা কমছে বলে দাবি শিল্পীদের।



কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণির পুতুলপট্টির মৃৎশিল্পী শম্ভু পাল জানান, প্রতি বছর লক্ষ্মীপুজোর আগে ছোট ছোট মূর্তি তৈরির কাজ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। অস্থায়ী দোকানদারদের পাশাপাশি বিভিন্ন দশকর্মার দোকান থেকেও প্রচুর বরাত আসে। কিন্তু এ বছর সেই পরিচিত ছবিতে বদল দেখা যাচ্ছে। ছোট মাটির মূর্তির জায়গা নিচ্ছে পিতলের বিগ্রহ। ফলে তৈরি করে রাখা মূর্তিগুলি বিক্রি হবে কি না, তা নিয়েই এখন উদ্বেগে রয়েছেন তিনি।

শম্ভু পালের আশঙ্কা, এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে আগামী দিনে কৃষ্ণনগরের পুতুলপট্টির বহু শিল্পী লক্ষ্মীপুজোর মরসুমে কাজ হারাতে পারেন। ছোট মূর্তির চাহিদা কমে গেলে তাঁদের উপার্জনেও বড় ধাক্কা লাগবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা মাটির প্রতিমা তৈরির পেশা তাই নতুন প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে।

তবে সব শিল্পীই যে ভবিষ্যৎ নিয়ে সমানভাবে হতাশ, তা নয়। তাঁদের একাংশের আশা, ছোট মাটির মূর্তির বাজারে কিছুটা ভাটা এলেও বড় প্রতিমার চাহিদা এখনও রয়েছে। সেই বাজারের উপর ভরসা করেই ক্ষতি সামাল দেওয়ার আশায় রয়েছেন তাঁরা। তবু লক্ষ্মীপুজোর মতো গুরুত্বপূর্ণ মরসুমে ছোট মূর্তির বিক্রি কমে যাওয়ার ইঙ্গিত কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।

Related posts

Leave a Comment