সংবাদ কলকাতা: শোকের আবহেই শনিবার বিকেলে নিমতলা ঘাটে নিরঞ্জন হল চোরবাগান সর্বজনীনের দুর্গাপ্রতিমা। গোটা প্রক্রিয়ায় পুজো কমিটির কোনও সদস্যের দেখা মেলেনি। কলকাতা পুলিশের উদ্যোগেই মণ্ডপ থেকে প্রতিমা বার করে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে গিয়ে নিরঞ্জনের ব্যবস্থা করা হয়। সঙ্গে ছিলেন এলাকার কয়েক জন বাসিন্দা। মোমবাতি হাতে শোকবার্তা জানিয়ে প্রতিমাকে বিদায় জানান তাঁরা। গত ১৭ অক্টোবর পুজোর সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনার স্মৃতি তখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছিল এলাকাবাসীকে।
প্রতিমা মণ্ডপ থেকে বার করার জন্য শুক্রবারই গেটের একাংশ কেটে ফেলা হয়েছিল। শনিবার দুপুরে পুলিশি উপস্থিতিতে শুরু হয় প্রতিমা বার করার প্রস্তুতি। মণ্ডপের গেটের কাটা অংশ দিয়ে প্রতিমা নামিয়ে এনে মালা পরানো হয়। ৩৬ জন মিলে প্রতিমাকে রাস্তা পর্যন্ত নিয়ে আসেন। এলাকার বহু মহিলা প্রতিমাকে প্রণাম করে বিদায় জানান। গোটা পরিবেশে ছিল বিষাদের ছায়া।
কিন্তু মণ্ডপ থেকে গঙ্গার ঘাট পর্যন্ত প্রতিমা কী ভাবে নিয়ে যাওয়া হবে, তা ঠিক করার মতো পুজো উদ্যোক্তা বা কমিটির কেউ সেখানে ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত পুলিশই পরিবহণের ব্যবস্থা করে। সিমলা ব্যায়াম সমিতির এক কর্মকর্তাকেও ডেকে আনা হয়। প্রথমে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি লরি আনা হয়েছিল। দড়ি ও বাঁশের সাহায্যে প্রতিমাটিকে লরিতে তোলার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। পরে লোহার কার্টের ব্যবস্থা করা হয়। সেই কার্টে প্রতিমা তুলে পুলিশি পাহারায় সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ দিয়ে নিমতলা ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়।

প্রতিমা নিরঞ্জনের সময় এলাকার বাসিন্দাদের চোখেমুখে ছিল শোক আর আতঙ্কের ছাপ। এক বয়স্ক মহিলা হাতজোড় করে প্রতিমাকে প্রণাম করেন। তাঁর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেন, এ বছর যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে, এমন দিন যেন আর কাউকে দেখতে না হয়। তাঁর কথায়, কত মানুষের মৃত্যু চোখের সামনে দেখতে হয়েছে, কত পরিবারের আলো নিভে গিয়েছে। এই দুর্দিন আর ফিরে না আসুক—প্রার্থনা করেন তিনি।
আর এক স্থানীয় বাসিন্দার কথাতেও উঠে আসে সেই রাতের আতঙ্ক। তাঁর দাবি, এখনও চিৎকার আর মৃত্যুর দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ঈশ্বরের কাছে তাঁর প্রার্থনা, এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি যেন আর হতে না হয় কাউকে।
পুজো কমিটির সদস্যদের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও এলাকার কয়েক জন বাসিন্দা প্রতিমা নিরঞ্জনে অংশ নেন। কেউ মোমবাতি হাতে প্রতিমার আগে আগে হাঁটেন। একটি ট্রাকের সামনে কালো ব্যানারে মৃত ও আহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়। নিরঞ্জনের এই পর্ব যেন উৎসবের সমাপ্তির চেয়ে শোক প্রকাশের উপলক্ষ হয়ে ওঠে।
উল্লেখ্য, গত ১৭ অক্টোবর দুর্গাপুজোর সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগানে ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন আরও ২৫ জন। কী ভাবে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল, তা জানতে তদন্ত চালাচ্ছে কলকাতা পুলিশ। এখনও পর্যন্ত এই ঘটনায় ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তদন্তের জন্য কলকাতা পুলিশের তরফে ছ’সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করা হয়েছে। গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী কমিশনার পদমর্যাদার এক আধিকারিকের নেতৃত্বে ওই দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখার পাশাপাশি, ঘটনার সময় মণ্ডপে উপস্থিত সিভিক ভলান্টিয়ার ও ক্লাব সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার ধারাবাহিকতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করা হয়েছে। পরে ফরেনসিক দলও ঘটনাস্থলে যায়।
সিটের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতীও চোরবাগানের পুজোমণ্ডপ পরিদর্শন করেন। তিনি জানিয়েছিলেন, প্রতিমা নিরঞ্জন করা হলেও প্যান্ডেলটি রেখে দেওয়া হবে। সেই সিদ্ধান্তের পরই শনিবার পুলিশের তত্ত্বাবধানে প্রতিমা নিরঞ্জন সম্পন্ন হল। তবে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় শোক, প্রশ্ন এবং তদন্তের অপেক্ষা—সবই রয়ে গেল চোরবাগানে।
