September 13, 2026
রাজ্য

ভূতনিতে ভাঙনের তাণ্ডব, নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে গ্রাম

নিজস্ব সংবাদদাতা, মালদহ— ঝপাৎ করে মুলিরাম টোলার বড় বাড়িটা গঙ্গার গর্ভে তলিয়ে গেল। কোমর সমান জলে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতো ঈশ্বরকে ডাকছিলেন নিবারণ মণ্ডল। চোখের সামনে শেষ সম্বলটুকু নদীতে মিশে যেতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। শুধু নিবারণ নন, মালদহের ভূতনি চরের বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের এখন একই আতঙ্ক— কখন যে মাথার উপর থাকা বাড়িটুকুও নদীতে চলে যায়, তার নিশ্চয়তা নেই।

গঙ্গার জল কিছুটা কমতেই শুরু হয়েছে ভাঙনের ভয়াবহ তাণ্ডব। রাজ্যের গঙ্গার দ্বিতীয় বৃহত্তম চর হিসেবে পরিচিত ভূতনি একদিকে গঙ্গা, অন্যদিকে ফুলহার ও কোশি নদী দিয়ে ঘেরা। কয়েক বছর ধরে কোশি নদীতে বড় ধরনের ভাঙন না হলেও এ বার পরিস্থিতি বদলেছে। প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কোশির ভাঙন শুরু হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। ইতিমধ্যেই সাতটি গ্রাম ধীরে ধীরে নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নদীর জল বাড়ি ছুঁয়ে ফেলতেই বহু পরিবার আর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। সর্বস্ব হারানোর আগে বাড়ির ইট, কাঠের দরজা, জানলা-সহ যতটা সম্ভব সামগ্রী খুলে নিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন তাঁরা। কোথাও বাড়ি ভাঙার কাজ চলছে, কোথাও আবার জলবন্দি মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে শ্রমিকও মিলছে না। ফলে নিজেরাই বাড়ি ভাঙার কাজে নেমে পড়েছেন বহু পরিবার।


ভূতনির পাশাপাশি কালিয়াচক-৩ নম্বর ব্লকের ছয়টি এলাকাতেও বন্যার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। অন্তত ২০০টি গ্রাম জলের কবলে বলে জানা গিয়েছে। পারদেওনাপুর শোভাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ এলাকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। রাস্তার উপর দিয়ে বইছে তীব্র স্রোত। দীর্ঘদিন ধরে জলবন্দি থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। প্রায় ২০ দিন ধরে জলমগ্ন বহু এলাকায় স্থলপথে পৌঁছনো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নৌকা ও টিনের তৈরি ডোঙ্গাই এখন যাতায়াতের প্রধান ভরসা। নৌকা না মিললে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ডোঙ্গায় পারাপার করছেন স্থানীয়রা।

রবিবার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে নৌকায় ওই এলাকায় যান রাজ্যের সেচ দপ্তর ও আদিবাসী উন্নয়ন দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী জুয়েল মুর্মু। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বৈষ্ণবনগরের বিধায়ক রাজু কর্মকার, বিজেপির দক্ষিণ মালদহ সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অজয় গঙ্গোপাধ্যায়, কালিয়াচক-৩ ব্লকের বিডিও, বৈষ্ণবনগর থানার আইসি এবং সেচ দপ্তরের আধিকারিকরা। পরিস্থিতি পরিদর্শনের পর মন্ত্রী জানান, এলাকা পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সরকারি নৌকা এবং বানভাসি মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

এ দিন নৌকায় ভূতনি এলাকা ঘুরে দেখেন দক্ষিণ মালদহের কংগ্রেস সাংসদ ইশা খান চৌধুরীও। অন্যদিকে, গর্ভবতী মহিলা ও অসুস্থদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে সিভিল ডিফেন্স। জলবন্দি মানুষের পাশাপাশি গবাদি পশু নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

ত্রাণ ও উদ্ধারকাজকে আরও দ্রুত ও সুশৃঙ্খল করতে মানিকচক ব্লকের ভূতনি এলাকায় উত্তর চণ্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত কার্যালয়ে জোনাল রিলিফ অফিস চালু করেছে মালদহ জেলা প্রশাসন। ওই কেন্দ্র থেকে নদী সংলগ্ন প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে দ্রুত ত্রাণ, চিকিৎসা, উদ্ধার সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

বুথ ও বসতি-ক্লাস্টারভিত্তিক ব্যবস্থায় শুকনো খাবার, ওষুধ, পশুখাদ্য, নৌকা, জেনারেটর-সহ জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে দুর্গত এলাকায়। প্রশাসনের দাবি, এর ফলে জলবন্দি মানুষকে ত্রাণ বা চিকিৎসার জন্য দূরে যেতে হবে না। মালদহের জেলাশাসক রাজনবীর সিং কাপূর জানিয়েছেন, প্রশাসনের সমস্ত আধিকারিক প্লাবিত এলাকায় কাজ করছেন এবং দুর্গত মানুষের পাশে প্রশাসন রয়েছে।


ভূতনির ভাঙন কীভাবে রোখা যায়, তা নিয়েও বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ভূতনি চর রক্ষায় আইআইটি কানপুরের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিচ্ছে রাজ্য। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর আইআইটি কানপুরের একটি প্রতিনিধি দল মালদহে আসতে পারে। ইতিমধ্যেই ভাঙন প্রতিরোধের উপায় নিয়ে সেচ দপ্তরের সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের বৈঠক হয়েছে। ফলে একদিকে ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি ভাঙন প্রতিরোধ— দুই দিকেই এখন জোর দিচ্ছে প্রশাসন।

Related posts

Leave a Comment