‘মুখ্যমন্ত্রীর উপর আস্থা আছে, রহস্যের সমাধান চাই’
হালিশহর: পুলিশ হেফাজতে স্বামী বিরজু কুমারের মৃত্যুর পর দুই সন্তানকে নিয়ে কঠিন লড়াইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন জেনি শর্মা কেওট (Jeni Sharma Keot)। স্বামীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, বিরজুর মৃত্যুর জন্য পুলিশই দায়ী। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) তাঁর পাশে দাঁড়ানোয় মুখ্যমন্ত্রীর উপর পূর্ণ আস্থা থাকার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পর জেনি জানান, তাঁকে অ্যাটেনডেন্টের চাকরি (Attendant Job) দেওয়া হয়েছে। তাঁর দুই সন্তানের পড়াশোনার জন্য ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। স্বামীকে হারানোর পর সংসারের দায়িত্ব একাই সামলাতে হবে তাঁকে। তাই সরকারি সাহায্য তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সবচেয়ে বড় দাবি স্বামীর মৃত্যুর সুবিচার।

জেনির একটি মেয়ের বয়স ৯ বছর। তাঁর দ্বিতীয় সন্তান আরও ছোট। স্বামীর মৃত্যুর পর দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা থাকলেও ভেঙে পড়তে চান না তিনি। সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পাশাপাশি বিরজুর মৃত্যুর সত্য সামনে আনার জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধেই গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন জেনি। তাঁর দাবি, শুক্রবার রাত ১০টা নাগাদ তিনি বিরজুর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। সেই সময় তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন বলে জানিয়েছেন জেনি। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ হেফাজতে তাঁর মৃত্যু হয়।
এই সময়ের মধ্যেই কী এমন ঘটল, যার কারণে বিরজুর মৃত্যু হল, সেই প্রশ্নের উত্তর চান তাঁর স্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, স্বামীকে যখন শেষ বার দেখেছিলেন তখন তাঁর শারীরিক অবস্থায় এমন কোনও লক্ষণ ছিল না, যা দেখে এমন পরিণতির আশঙ্কা করা যায়। তাই ঘটনার শেষ কয়েক ঘণ্টার পুরো বিবরণ তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসা প্রয়োজন।

পরিবারের দাবি, উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচরাপাড়ার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা বিরজু কুমারকে শুক্রবার রাতে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। মেডিক্যাল পরীক্ষার সময় তিনি সুস্থ ছিলেন বলেও পরিবারের তরফে দাবি করা হয়েছে। পরে গভীর রাতে পুলিশ হেফাজতে তাঁর মৃত্যু হয়। পুলিশের অত্যাচারেই মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের।
ঘটনার পর সোমবার মুখ্যমন্ত্রী নিহতের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁর সঙ্গে রাজ্য পুলিশের ডিজি (Director General of Police), বারাকপুরের পুলিশ কমিশনার এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ছিলেন। পরিবারকে আশ্বস্ত করার পাশাপাশি হালিশহর থানার আইসি (IC)কে ক্লোজ এবং তদন্তকারী আধিকারিককে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়।
মুখ্যমন্ত্রীর তরফে জেনিকে চাকরি এবং তাঁর সন্তানদের জন্য আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্তে তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তবে তাঁর বক্তব্য, চাকরি বা অর্থের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হল বিরজুর মৃত্যুর বিচার। পুলিশের কোনও আধিকারিকের গাফিলতি বা অপরাধ প্রমাণিত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

এর আগে রবিবার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) হালিশহরে বিরজুর বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে যাওয়ার পথে তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে কাদা ও জুতো ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। উত্তেজনার মধ্যেও তিনি শেষ পর্যন্ত নিহতের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছন। তবে জেনির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়নি।
মমতার সঙ্গে দেখা না করার কারণ হিসেবে জেনি জানিয়েছেন, সেই সময় তিনি ঘুমোচ্ছিলেন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ভবিষ্যতে তাঁর বাড়িতে এলে তিনি দেখা করবেন কি না, সেই প্রশ্নে অবশ্য কোনও স্পষ্ট উত্তর দেননি নিহতের স্ত্রী।
বিরজুর মৃত্যু ইতিমধ্যেই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিসরে বড় বিতর্ক তৈরি করেছে। শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ চলছে। কিন্তু নিহতের স্ত্রী জেনির কাছে এই মুহূর্তে রাজনৈতিক বিতর্কের চেয়ে বড় বিষয় হল স্বামীর মৃত্যুর তদন্ত এবং দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ।

ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব জেলাশাসকের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মুখ্যসচিবের তরফে এ বিষয়ে সরকারি বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করার কথা রয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে বিরজুর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং তাঁর শেষ কয়েক ঘণ্টায় কী ঘটেছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে পরিবার।
