August 3, 2026
খেলা

কমনওয়েলথ টেবল টেনিসে চ্যাম্পিয়ন বাংলার অঙ্কুর ভট্টাচার্য

ভারতীয় দলে বঞ্চনার জবাব সোনায়

দিল্লি: ভারতীয় দলে সুযোগ না পাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিলেন বাংলার তরুণ টেবল টেনিস খেলোয়াড় অঙ্কুর ভট্টাচার্য। সম্প্রতি তাঁকে এশিয়ান গেমসের ভারতীয় দল থেকে বাদ দেওয়া হয়। এমনকী কমনওয়েলথ টেবল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপের দলগত ইভেন্টেও জায়গা হয়নি তাঁর। সেই হতাশাকে শক্তিতে পরিণত করে শেষ পর্যন্ত পুরুষদের সিঙ্গলসে সোনার পদক জিতে নির্বাচকদের সিদ্ধান্তের জবাব দিলেন বাংলার এই প্রতিভাবান প্যাডলার।

দিল্লিতে আয়োজিত ২২তম কমনওয়েলথ টেবল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপের পুরুষদের সিঙ্গলস ফাইনালে অঙ্কুরের প্রতিপক্ষ ছিলেন তাঁরই ডাবলস সঙ্গী পায়াস জৈন। সাত গেমের রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে ১১-৮, ৯-১১, ৭-১১, ১১-৮, ৪-১১, ১১-৪, ১১-৯ ফলে জয় তুলে নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হন অঙ্কুর। ম্যাচের একাধিক সময়ে পিছিয়ে পড়লেও শেষ দুই গেমে অসাধারণ প্রত্যাবর্তন করে সোনার পদক নিশ্চিত করেন তিনি।

মহিলাদের সিঙ্গলসেও ভারতের সাফল্য অব্যাহত থাকে। ফাইনালে যশস্বিনী ঘোরপাড়ে নিজেরই দেশের শ্রীজা আকুলাকে ১১-৬, ১১-১, ৮-১১, ১১-৭, ১৩-১১ ফলে হারিয়ে সোনা জেতেন। দুই সিঙ্গলস শিরোপা জয়ের পাশাপাশি গোটা প্রতিযোগিতাতেই প্রায় সব সোনার পদক নিজেদের দখলে রাখে ভারত।

অঙ্কুরের এই সাফল্যের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় তাঁর সাম্প্রতিক বঞ্চনার প্রেক্ষাপটে। এশিয়ান গেমসের দল থেকে বাদ পড়ার পাশাপাশি কমনওয়েলথ টেবল টেনিসের দলগত বিভাগেও সুযোগ পাননি তিনি। সিঙ্গলসে খেলার সুযোগও আসে শুধুমাত্র আয়োজক দেশ হিসেবে ভারতের অতিরিক্ত কোটার সুবাদে। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার নজির গড়লেন বাংলার এই খেলোয়াড়।

তবে শিরোপা জয়ের পথ মোটেই সহজ ছিল না। প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে তিনি ৪-০ ফলে হারান মালয়েশিয়ার ওয়ং কি শেনকে। দলগত বিভাগে ভারতের দুই তারকা খেলোয়াড় মানব ঠক্কর এবং মনুশ শাহকে হারিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন ওয়ং। তাঁকে একতরফা ম্যাচে হারিয়ে নিজের ছন্দের ইঙ্গিত দেন অঙ্কুর।

কোয়ার্টার ফাইনালে তাঁর সামনে ছিল আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ। প্রতিপক্ষ ছিলেন বিশ্বের ৪৪ নম্বর এবং প্রতিযোগিতার তৃতীয় বাছাই অস্ট্রেলিয়ার নিকোলাস লাম। আগের সাক্ষাতে লামের কাছে হেরেছিলেন অঙ্কুর। কিন্তু এ বার দুরন্ত ব্যাকহ্যান্ড এবং আক্রমণাত্মক ফোরহ্যান্ডের দাপটে জয় তুলে নিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছে যান তিনি।

শেষ চারে ভারতের অন্যতম সেরা প্যাডলার মানব ঠক্করকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠেন অঙ্কুর। সেই ম্যাচে তাঁর উন্নত ফোরহ্যান্ড এবং ধারাবাহিক আক্রমণাত্মক খেলা বিশেষ ভাবে নজর কাড়ে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাকহ্যান্ডের জন্য পরিচিত হলেও গত কয়েক মাসে নিজের খেলায় যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছেন, তারই প্রতিফলন দেখা যায় এই ম্যাচে।

খেতাব জয়ের পর অঙ্কুর বলেন, ‘এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা ছিল। আমি যে ভারতীয় দলে জায়গা পাওয়ার যোগ্য, এশিয়ান গেমসের দলেও আমার থাকার কথা ছিল, সেটা প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম।’

ফাইনালে ডাবলস সঙ্গী পায়াস জৈনের বিরুদ্ধে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়েও মুখ খোলেন তিনি। অঙ্কুর বলেন, ‘পায়াস আমার খুব ভালো বন্ধু। আমরা একসঙ্গে অনুশীলন করি। একে অপরের শক্তি এবং দুর্বলতা দু’জনেই জানি। তাই ফাইনালটা খুব কঠিন ছিল। তবে খেতাব জিততে পেরে আমি ভীষণ আনন্দিত।’

এশিয়ান গেমসের দল থেকে বাদ পড়ার প্রসঙ্গে তিনি জানান, কোনও প্রতিযোগিতাকে ছোট করে দেখেন না। তাঁর কথায়, ‘আমি কোন দলে আছি, আর কোন দলে নেই, সেটা নিয়ে খুব বেশি ভাবি না। আমি যে প্রতিযোগিতাতেই খেলি, জেতার লক্ষ্য নিয়েই নামি। প্রতিটি টুর্নামেন্ট আমার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।’

সমালোচনা এবং সংশয়ই তাঁকে আরও অনুপ্রাণিত করেছে বলেও জানিয়েছেন অঙ্কুর। তাঁর বক্তব্য, ‘মানুষ যখন আমাকে নিয়ে সন্দেহ করে, তখন নিজেকে আরও প্রমাণ করার ইচ্ছা জাগে। অনেকেই ভেবেছিলেন, অতিরিক্ত কোটার জন্যই আমি সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, নিজের সেরা খেলাটা খেলতে পারলে যে কোনও প্রতিপক্ষকে হারানো সম্ভব।’

এই সাফল্যের মাধ্যমে শুধু একটি আন্তর্জাতিক খেতাবই জিতলেন না অঙ্কুর ভট্টাচার্য। একই সঙ্গে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, বড় মঞ্চে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে। কমনওয়েলথ টেবল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে এই সোনা ভবিষ্যতে ভারতীয় দলে তাঁর দাবিকে আরও জোরালো করল।

Related posts

Leave a Comment