28 C
Kolkata
September 18, 2026
কলকাতা

ছুটন্ত ট্রেনেই বিশ্বকর্মা পুজো, ২০ বছরে শান্তিপুর-শিয়ালদহের অভিনব পরম্পরা

নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা— পুজোর মণ্ডপে নয়, কারখানার চৌহদ্দিতেও নয়। লোহার চাকায় ছুটতে থাকা ট্রেনের কামরাই এখানে বিশ্বকর্মার মন্দির। প্রতিদিন যে ট্রেন হাজার হাজার মানুষকে কর্মস্থলে পৌঁছে দেয়, বিশ্বকর্মা পুজোর দিন সেই ট্রেনের কামরাতেই দেবশিল্পীর আরাধনায় মেতে ওঠেন নিত্যযাত্রীরা। ডাউন শান্তিপুর-শিয়ালদহ লোকালের প্রথম কামরার দ্বিতীয় গেটের নিত্যযাত্রীদের উদ্যোগে আয়োজিত এই ভ্রাম্যমাণ বিশ্বকর্মা পুজো এবার ২০ বছরে পা দিল। অন্যদিকে, ধানবাদ-হাওড়া কোলফিল্ড এক্সপ্রেসেও ২৯ বছর ধরে একই ভাবে পুজোর আয়োজন করে আসছেন নিত্যযাত্রীরা।

প্রায় দুই দশক আগে মাত্র ৩০ জন নিত্যযাত্রীকে নিয়ে শুরু হয়েছিল শান্তিপুর-শিয়ালদহ লোকালের এই পুজো। সময়ের সঙ্গে সেই পরিবার বড় হয়েছে। বর্তমানে এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত নিত্যযাত্রীর সংখ্যা ১৭৫ ছাড়িয়েছে। চাকরিজীবী থেকে ব্যবসায়ী, হকার—পেশা আলাদা হলেও ট্রেনের কামরায় উঠলেই তাঁরা যেন একই পরিবারের সদস্য। প্রতিদিনের যাতায়াত, কর্মস্থলে পৌঁছনো এবং জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা এই রেলপথকেই তাই বিশ্বকর্মার আরাধনার কেন্দ্র করে নিয়েছেন তাঁরা।

বিশ্বকর্মা পুজোর দিন সকাল থেকেই শান্তিপুর স্টেশনে শুরু হয়ে যায় সাজসজ্জা। ফুলের মালা ও কলাগাছ দিয়ে সাজানো হয় নির্দিষ্ট কামরা। স্টেশন মাস্টার এবং আরপিএফ কর্মীদের মিষ্টি বিতরণের পর শুরু হয় পুজোর বিশেষ যাত্রা। ট্রেন চলতে শুরু করলেই কামরার ভিতরে শুরু হয় নৈবেদ্য সাজানো এবং পুজোর প্রস্তুতি।


রানাঘাটে পুরোহিত পুজোয় বসেন। এরপর ট্রেন শ্যামনগরে পৌঁছলে সম্পন্ন হয় বিশ্বকর্মার আরাধনা। ব্যারাকপুর পর্যন্ত চলে প্রসাদ বিতরণ। তারপর শিয়ালদহে পৌঁছে যাত্রীরা যে যার কর্মস্থলের পথে চলে গেলেও কামরায় থেকে যান বিশ্বকর্মা। দিনের শেষে ট্রেন কারশেডে পৌঁছলে প্রতিমা নামিয়ে রাখা হয়। পরদিন নিয়ম মেনে হয় বিসর্জন।

নিত্যযাত্রীদের কাছে এই পুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, তাঁদের দীর্ঘদিনের সম্পর্কেরও প্রতীক। প্রতিদিন একই কামরায় যাতায়াত করতে করতে তৈরি হয়েছে পারিবারিক বন্ধন। তাই পুজোর দিনটিও তাঁদের কাছে হয়ে ওঠে এক মিলন উৎসব।

একই ছবি ধানবাদ-হাওড়া কোলফিল্ড এক্সপ্রেসেও। এই ট্রেনের নিত্যযাত্রীদের কাছে বিশ্বকর্মা পুজো মানেই দীর্ঘদিনের এক আবেগ ও পরম্পরা। ২৯ বছর ধরে ট্রেনের নির্দিষ্ট কামরায় নিয়ম করে এই পুজোর আয়োজন হয়ে আসছে। আসানসোল, বরাকর, ধানবাদ, দুর্গাপুর-সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন ট্রেনে ওঠেন যাত্রীরা। কিন্তু কামরায় পা রাখার পর সেই ভৌগোলিক দূরত্ব আর থাকে না। দীর্ঘদিনের যাতায়াতে তৈরি হওয়া সম্পর্ক তাঁদের এক পরিবারের মতো করে তুলেছে।

পুজোর প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি। নিত্যযাত্রীরাই নিজেদের মধ্যে চাঁদা তোলেন। সেই টাকাতেই প্রতিমা, পুজোর সামগ্রী থেকে শুরু করে প্রসাদ বিতরণ—সব আয়োজন করা হয়। কে কী দায়িত্ব নেবেন, কোথায় প্রতিমা বসবে, কী ভাবে পুজো হবে, তা নিয়ে আগে থেকেই শুরু হয় আলোচনা।


পুজোর দিন নির্দিষ্ট কামরায় বসানো হয় বাবা বিশ্বকর্মার মূর্তি। চলন্ত ট্রেনের মধ্যেই নিয়ম মেনে হয় পুজো-অর্চনা। যাত্রাপথের মধ্যেই ভক্তিভরে আরাধনায় যোগ দেন নিত্যযাত্রীরা। পুজো শেষে সকলের মধ্যে বিতরণ করা হয় প্রসাদ।

কোলফিল্ড এক্সপ্রেসের নিত্যযাত্রী সঞ্জয় চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘২৯ বছর ধরে ট্রেনের ভিতরে এই ভাবে বিশ্বকর্মার পুজো হয়ে আসছে। পুজো শেষে সমস্ত যাত্রীকে প্রসাদ খাওয়ানো হয়। এই পুজো একটা মিলন উৎসবে পরিণত হয়েছে।’

ট্রেনের কামরায় বিশ্বকর্মা পুজোর এই দুই পরম্পরা দেখিয়ে দেয়, কর্মজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা যাতায়াতের মাধ্যমও কী ভাবে মানুষের বিশ্বাস, সম্পর্ক এবং উৎসবের অংশ হয়ে উঠতে পারে। লোহার চাকায় ছুটতে ছুটতেই তাই প্রতি বছর পূর্ণতা পায় এই অভিনব বিশ্বকর্মা আরাধনা।

Related posts

Leave a Comment