নিজস্ব সংবাদদাতা, উত্তর ২৪ পরগনা— গাইঘাটায় কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের মামলায় অভিযুক্ত প্রহ্লাদ দাসের পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর ঘটনায় কড়া অবস্থানের বার্তা দিলেন রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, অপরাধ দমনে পুলিশের পদক্ষেপে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রয়োজনে পুলিশকে কিছু অপ্রিয় কাজও করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। এর আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে একই ধরনের ঘটনায় অভিযুক্তের মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনেও বক্তব্য রাখেন মন্ত্রী। তবে গাইঘাটার ঘটনার পর পুলিশের ভূমিকা, আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার পরিস্থিতি এবং আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
মঙ্গলবার সকালে গাইঘাটার ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে দিলীপ বলেন, এর আগেও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় এমন ঘটনা ঘটেছে। সেখানেও অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করেছিল বলে দাবি করা হয়েছিল। গাইঘাটাতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। মন্ত্রীর বক্তব্য, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। কেউ আইন অমান্য করলে তাঁকে তার পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরানোর প্রসঙ্গ তুলে দিলীপ বলেন, মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়া নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছিল। তাই অপরাধ দমনের পাশাপাশি সমাজে সুবিচার প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধের উপযুক্ত শাস্তির দৃষ্টান্ত তৈরি করাও প্রয়োজন। এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যাতে অপরাধ করার আগে মানুষ তার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গাইঘাটায় কী ঘটেছিল?
পুলিশ সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে ২৩ বছরের প্রহ্লাদ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। রবিবার কিশোরীর দেহ উদ্ধারের পর পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। পরে প্রহ্লাদকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পেশ করা হয়। তদন্তের অংশ হিসেবে সোমবার রাতে তাকে ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।
পুলিশের দাবি, পুনর্নির্মাণের কাজ শেষে ফেরার সময় প্রহ্লাদ এক পুলিশকর্মীর সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায় পুলিশ। তাতে গুলিবিদ্ধ হয় প্রহ্লাদ। পরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তবে কীভাবে পুলিশি হেফাজতে থাকা এক অভিযুক্তের পক্ষে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া সম্ভব হল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনাটির পরিস্থিতি এবং গুলিচালনার সম্পূর্ণ বিবরণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলেও বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠেছে। প্রহ্লাদের মৃত্যুর পর ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ পরিস্থিতি জানতে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
গাইঘাটার ঘটনায় পুলিশের পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন দিলীপ ঘোষ। কিন্তু তাৎক্ষণিক গুলিচালনা বা এনকাউন্টারকে বিচারের বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ভিন্নমত সামনে এসেছে। তৃণমূলের প্রবীণ বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন, এনকাউন্টারের মাধ্যমে প্রচার পাওয়া সম্ভব হলেও দেশে আইন রয়েছে। ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে দ্রুত বিচার ও শাস্তির প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীও পুলিশের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, অভিযুক্ত কীভাবে পুলিশের বন্দুক হাতে পেল, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। এর জবাবে রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়া বলেছেন, পুলিশ প্রশাসন কীভাবে চলবে, তার নির্দেশিকা বিরোধীদের কাছ থেকে নেওয়া হবে না। তাঁর বক্তব্য, কেউ পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পুলিশকর্মীদের আক্রমণ করলে পুলিশ আত্মরক্ষার পদক্ষেপ করতে পারে।
মানবাধিকার সংগঠনের উদ্বেগ
গাইঘাটার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর। সংগঠনের সহসভাপতি রঞ্জিত শূরের বক্তব্য, গভীর রাতে অভিযুক্তকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করতে যাওয়া এবং সেই সময় তার হাত খোলা থাকার বিষয়টি সন্দেহের অবকাশ তৈরি করেছে। পুলিশের সার্ভিস রিভলভার কীভাবে অভিযুক্তের হাতে গেল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

অন্যদিকে, নিহত কিশোরীর পরিবারের তরফে পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এসেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে পরিবারের ক্ষোভ বা স্থানীয় মানুষের প্রতিক্রিয়া যাই হোক, ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণের জন্য তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্তে পৌঁছনো জরুরি।
গাইঘাটার ঘটনা ফের রাজ্যে নারী নিরাপত্তা, অপরাধ দমন এবং পুলিশের ক্ষমতা প্রয়োগের সীমা নিয়ে বিতর্ক সামনে এনেছে। অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনই পুলিশি পদক্ষেপের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রহ্লাদ দাসের মৃত্যুর পরিস্থিতি, আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার দাবি এবং পুলিশের গুলিচালনার প্রয়োজনীয়তা—এই প্রশ্নগুলির উত্তর তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
