পূর্ব মেদিনীপুর — পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল। প্রথমবারের জন্য কোনও জেলা পরিষদে বোর্ড গঠন করল বিজেপি। আর সেই নজির গড়ল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর জেলা পূর্ব মেদিনীপুর। দীর্ঘদিন তৃণমূলের দখলে থাকা পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদে নতুন সভাধিপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিজেপির বামদেব গুছাইত। সহ-সভাধিপতি হয়েছেন বাঁশুরি পণ্ডিত। এই ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহল।
বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই পূর্ব মেদিনীপুরে তৃণমূলের সংগঠনিক ভিত নড়বড়ে হতে শুরু করেছিল। একের পর এক জনপ্রতিনিধি এবং পদাধিকারীর ইস্তফায় সেই সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কয়েক দিন আগে জেলা পরিষদের সভাধিপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন তৃণমূলের উত্তম বারিক। পটাশপুরের প্রাক্তন বিধায়ক উত্তম এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে চণ্ডীপুর কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। এরপর সভাধিপতির পদ ছেড়ে দিয়ে তিনি জানান, পদ আঁকড়ে থাকার কোনও অর্থ নেই।
উত্তম বারিকের ইস্তফার কিছুদিনের মধ্যেই পদত্যাগ করেন জেলা পরিষদের সহ-সভাধিপতি সুহাসিনী কর। ফলে জেলা পরিষদের শীর্ষ নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হয়। এর আগে হলদিয়া পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ পার্থ বটব্যাল, ময়না পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি শাহজাহান আলি এবং পাঁশকুড়া পঞ্চায়েত সমিতির সভানেত্রী পম্পা সাঁতরা রাউতের মতো একাধিক তৃণমূল পদাধিকারীও দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদের মোট আসন সংখ্যা ৭০। নির্বাচনের সময় তৃণমূলের সদস্য সংখ্যা ছিল ৫৬ এবং বিজেপির ১৪। পরে দুই সদস্যের মৃত্যু হওয়ায় কার্যকর সদস্য সংখ্যা কমে যায়। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের আবহে সোমবার জেলা পরিষদের সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত সদস্যদের সমর্থনে নতুন সভাধিপতি হিসেবে নির্বাচিত হন বামদেব গুছাইত। সহ-সভাধিপতি হিসেবে নির্বাচিত হন বাঁশুরি পণ্ডিত। পাশাপাশি জয়দেব মিদ্যা এবং পূর্ণিমা দাসের নামও বিভিন্ন পদে প্রস্তাব করা হয় এবং সর্বসম্মতিক্রমে তা গৃহীত হয়|
নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের পর জেলা পরিষদের সতীশচন্দ্র সামন্ত সভাকক্ষে সংবর্ধনা দেওয়া হয় নবনির্বাচিত পদাধিকারীদের। বাইরে বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। আতসবাজি ফাটিয়ে এবং বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে বিজয় উদ্যাপন করেন তাঁরা। পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদে বিজেপির প্রথম বোর্ড গঠনকে ঘিরে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উৎসবের আবহ তৈরি হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কাঁথির সাংসদ সৌমেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, ‘এখন শুধু ডবল ইঞ্জিন নয়, পূর্ব মেদিনীপুরে পঞ্চম ইঞ্জিনও যুক্ত হয়েছে।’ তাঁর বক্তব্য, কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার, সাংসদ, বিধায়ক এবং এখন জেলা পরিষদ— সব ক্ষেত্রেই বিজেপির প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। ফলে উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও দ্রুত হবে এবং সাধারণ মানুষ সরাসরি তার সুফল পাবেন।
ঘটনার রাজনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে সমাজমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। তিনি লিখেছেন, পশ্চিমবঙ্গে এই প্রথম কোনও জেলা পরিষদে বোর্ড গঠন করল ভারতীয় জনতা পার্টি। তাঁর বক্তব্য, পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদ এখন থেকে বিজেপি সদস্যদের নেতৃত্বে পরিচালিত হবে এবং জেলার উন্নয়নকে আরও গতিশীল করতে নতুন বোর্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদে বিজেপির বোর্ড গঠন শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং রাজ্যের পঞ্চায়েত রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য বদলেরও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। বিশেষ করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর জেলায় এই সাফল্য বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি আরও মজবুত হওয়ার বার্তা দিয়েছে। আগামী দিনে জেলার উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক সমীকরণ— উভয় ক্ষেত্রেই এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
