35.2 C
Kolkata
June 22, 2026
state

সুহরাওয়ার্দি অ্যাভিনিউর নাম বদল নিয়ে বিতর্ক, কংগ্রেসকে তোপ অমিত মালব্যের, ‘এই উত্তরাধিকারের প্রতি বাংলার কোনও ঋণ নেই’

কলকাতা — কলকাতার সুহরাওয়ার্দি অ্যাভিনিউর নাম পরিবর্তন করে গোপাল মুখার্জি রোড করার সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। এই ইস্যুতে কংগ্রেসের সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে বিজেপি নেতা অমিত মালব্য দাবি করেছেন, সুহরাওয়ার্দি নামের সঙ্গে বাংলার যে ঐতিহাসিক স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে, স্বাধীন ভারতে তা সম্মান জানানোর কোনও কারণ নেই। তাঁর বক্তব্য ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কের নাম সুহরাওয়ার্দি অ্যাভিনিউ থেকে বদলে গোপাল মুখার্জি রোড করা হয়েছে। এরপরই কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আপত্তি তোলা হয়। কংগ্রেস নেতাদের দাবি, ওই রাস্তার নামকরণ হয়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য হাসান সুহরাওয়ার্দির নামে, হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দির নামে নয়। ফলে ইতিহাস না জেনেই বিজেপি এই পদক্ষেপ করেছে বলে অভিযোগ তোলেন তাঁরা।

কংগ্রেস নেতা পবন খেরা সমাজমাধ্যমে লেখেন, বিজেপি নেতারা হাসান সুহরাওয়ার্দি এবং হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দির মধ্যে পার্থক্যই জানেন না। তাঁর মতে, ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই এই বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশও একই সুরে বিজেপির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, হাসান সুহরাওয়ার্দি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন এবং পরে সেই পদে দায়িত্ব নিয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তাঁর আগে উপাচার্যের দায়িত্বে ছিলেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট না জেনেই বিজেপি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিতর্ক তৈরি করছে বলে অভিযোগ করেন জয়রাম।

তবে কংগ্রেসের এই অবস্থানের তীব্র বিরোধিতা করেছেন বিজেপির তথ্যপ্রযুক্তি সেলের প্রধান অমিত মালব্য। তিনি বলেন, কংগ্রেস যে বিষয়টি নিয়ে এত আপত্তি করছে, তা আসলে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে আড়াল করার চেষ্টা। তাঁর বক্তব্য, যদি হাসান সুহরাওয়ার্দির প্রসঙ্গও ধরা হয়, তা হলেও স্বাধীন ভারতের কাছে তাঁকে বিশেষভাবে স্মরণ করার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। কারণ তিনি ব্রিটিশ শাসনকালের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।

অমিত মালব্য আরও দাবি করেন, বাংলার মানুষের স্মৃতিতে সুহরাওয়ার্দি নাম সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে রয়েছে হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দির সঙ্গে। অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্টের ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-এর সময় দায়িত্বে ছিলেন। সেই সময় কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটে, যাতে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

বিজেপি নেতার দাবি, সেই রক্তক্ষয়ী অধ্যায় বাংলার ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল এবং দেশভাগের পথকে আরও প্রশস্ত করেছিল। তাঁর কথায়, হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দির রাজনৈতিক ভূমিকা সেই ঘটনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। পরবর্তীকালে তিনি পাকিস্তানে চলে যান এবং সে দেশের প্রধানমন্ত্রীও হন। মালব্যর দাবি, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করে দেয় তিনি কোন রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করতেন।

সুহরাওয়ার্দি পরিবারের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মালব্য। তাঁর মতে, পরিবারের একাংশের রাজনৈতিক অবস্থান ভারত নয়, পাকিস্তানের সঙ্গেই বেশি ঘনিষ্ঠ ছিল। সেই কারণেই স্বাধীন ভারতের জনপরিসরে এই নাম বহাল রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রাস্তার নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বিজেপি নেতা বলেন, এটি শুধুমাত্র প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ইতিহাসের একটি অসঙ্গতি সংশোধনের পদক্ষেপ। স্বাধীন ভারতে সেইসব ব্যক্তিত্ব ও ঐতিহ্যকে সম্মান জানানো উচিত, যাঁরা দেশের মানুষ এবং জাতীয় স্বার্থের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ঔপনিবেশিক শাসন, মুসলিম লিগের রাজনীতি এবং দেশভাগের বিতর্কিত অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নামে জনপরিসর বজায় রাখার প্রয়োজন নেই বলেই তাঁর মত।

এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। একদিকে ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক, অন্যদিকে জনস্মৃতিতে কোন ব্যক্তিত্বের স্থান হওয়া উচিত তা নিয়ে মতপার্থক্য— সব মিলিয়ে সুহরাওয়ার্দি অ্যাভিনিউর নাম পরিবর্তন এখন রাজ্যের রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

Leave a Comment