২০১১ থেকে ২০২১-এর পরিসংখ্যানে কী ছবি?
সংবাদ কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা গত এক দশকে বেড়েছে এবং একই সময়ে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে যুব বেকারত্বের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু ২০ থেকে ৩৪ বছর বয়সি পুরুষদের ক্ষেত্রে ‘কখনও বিয়ে করেননি’—এই সূচকের দিকে তাকালে ভিন্ন ছবি দেখা যাচ্ছে। ২০১১ সালের তুলনায় ২০১৯–২১-এর জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষায় এই তিন বয়সগোষ্ঠীতেই অবিবাহিত থাকার হার কমেছে। ফলে ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে যুবকেরা বেশি অবিবাহিত হয়ে পড়েছেন’—এমন সরাসরি দাবি পাওয়া তথ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

জনসংখ্যা বেড়েছে, তবে ২০২১-এর সংখ্যা জনগণনার নয়
২০১১ সালের জনগণনায় পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যা ছিল ৯ কোটি ১২ লক্ষ ৭৬ হাজার ১১৫। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৬৮ লক্ষ ৯ হাজার ২৭ এবং মহিলার সংখ্যা ৪ কোটি ৪৪ লক্ষ ৬৭ হাজার ৮৮।
তবে ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে পূর্ণ জনগণনা হয়নি। তাই ২০২১-এর ক্ষেত্রে প্রকৃত জনগণনার সংখ্যা নয়, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের জনসংখ্যা-প্রক্ষেপণ ব্যবহার করতে হয়েছে। সেই প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০২১ সালে রাজ্যের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৯ কোটি ৮১ লক্ষ ২৫ হাজার হওয়ার কথা ছিল। পুরুষের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৯ লক্ষ ৫ হাজার এবং মহিলার সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৮০ লক্ষ ২৯ হাজার।

অর্থাৎ ২০১১ থেকে ২০২১-এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা আনুমানিক ৬৮.৫ লক্ষ বাড়ার প্রক্ষেপণ ছিল। মোট জনসংখ্যার হিসাবে বৃদ্ধির হার প্রায় ৭.৫ শতাংশ। তবে এই তুলনায় ২০২১-এর সংখ্যা যে প্রকৃত জনগণনার হিসাব নয়, তা মনে রাখা জরুরি।
যুব বেকারত্বে গ্রামাঞ্চলে চাপ বেড়েছে
যুব বেকারত্বের ক্ষেত্রে ২০১১ ও ২০২১-এর সরাসরি জনগণনা-ভিত্তিক তুলনা করা যায় না। কারণ ২০১১ সালে বর্তমানের মতো পর্যায়ক্রমিক শ্রমশক্তি সমীক্ষা ছিল না। তাই ২০১১–১২ সালের জাতীয় নমুনা সমীক্ষা এবং ২০২০–২১ সালের পর্যায়ক্রমিক শ্রমশক্তি সমীক্ষার তথ্য পাশাপাশি রাখা হয়েছে। দুই ক্ষেত্রেই ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের যুব হিসেবে ধরা হয়েছে এবং সাধারণত ব্যবহৃত কর্মস্থিতির ভিত্তিতে বেকারত্বের হার হিসাব করা হয়েছে।
২০১১–১২ সালে পশ্চিমবঙ্গে ১৫–২৯ বছর বয়সিদের বেকারত্বের হার গ্রামাঞ্চলে ছিল ৭.৩ শতাংশ। শহরাঞ্চলে এই হার ছিল ১৩.২ শতাংশ। ২০২০–২১ সালে গ্রামাঞ্চলে হার বেড়ে দাঁড়ায় ১০.৪ শতাংশে এবং শহরে ১৩.৪ শতাংশে। অর্থাৎ গ্রামীণ যুব বেকারত্ব প্রায় ৩.১ শতাংশ-বিন্দু বেড়েছে। শহরে পরিবর্তন হয়েছে মাত্র ০.২ শতাংশ-বিন্দু।

এই পরিসংখ্যানের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, বেকারত্বের হারকে মোট বেকার যুবকের সংখ্যা হিসেবে দেখা যায় না। এটি শ্রমবাজারে সক্রিয় মানুষের মধ্যে বেকারের অনুপাত। ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের পরিবর্তনের সঙ্গে বেকারের মোট সংখ্যার হিসাব আলাদা হতে পারে।
অবিবাহিত পুরুষের হার কমেছে তিন বয়সগোষ্ঠীতেই
বিয়ের ক্ষেত্রে ছবিটি তুলনামূলকভাবে আলাদা। ২০১১ সালের পশ্চিমবঙ্গের তথ্যের সঙ্গে ২০১৯–২১ সালের জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার তথ্য তুলনা করলে ২০–২৪, ২৫–২৯ এবং ৩০–৩৪ বছর বয়সি পুরুষদের মধ্যে কখনও বিয়ে না-করা মানুষের হার তিন ক্ষেত্রেই কমেছে।
২০–২৪ বছর বয়সি পুরুষদের মধ্যে ২০১১ সালে কখনও বিয়ে না-করা মানুষের হার ছিল আনুমানিক ৭৩.৪ শতাংশ। ২০১৯–২১-এ তা নেমে আসে ৬৯ শতাংশে। অর্থাৎ হ্রাস প্রায় ৪.৪ শতাংশ-বিন্দু।
২৫–২৯ বছর বয়সিদের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আরও বেশি। ২০১১ সালে অবিবাহিত থাকার হার ছিল প্রায় ৪১.৮ শতাংশ। ২০১৯–২১-এ তা কমে হয় ৩৫.২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ৬.৬ শতাংশ-বিন্দু হ্রাস।
৩০–৩৪ বছর বয়সি পুরুষদের মধ্যে ২০১১ সালে কখনও বিয়ে না-করা মানুষের হার ছিল প্রায় ১৭.৫ শতাংশ। ২০১৯–২১-এ তা কমে দাঁড়ায় ১২.৪ শতাংশে। অর্থাৎ প্রায় ৫.১ শতাংশ-বিন্দু হ্রাস হয়েছে।
১৯৭১ থেকে দেখলেও দীর্ঘমেয়াদি ছবিতে পরিবর্তন স্পষ্ট
শুধু ২০১১ ও ২০১৯–২১ নয়, ১৯৭১ সালের জনগণনার তথ্যের সঙ্গে তুলনা করলেও বিয়ের বয়স ও বৈবাহিক অবস্থার পরিবর্তন বোঝা যায়। ১৯৭১ সালে ২০–২৪ বছর বয়সি পুরুষদের মধ্যে কখনও বিয়ে না-করা মানুষের হার ছিল ৬১.৯ শতাংশ। ২৫–২৯ বছর বয়সিদের ক্ষেত্রে তা ২৭.২ শতাংশ এবং ৩০–৩৪ বছর বয়সিদের ক্ষেত্রে ১০.১ শতাংশ।
২০১১ সালে এই হার যথাক্রমে বেড়ে দাঁড়ায় ৭৩.৪, ৪১.৮ এবং ১৭.৫ শতাংশে। কিন্তু ২০১৯–২১-এর সমীক্ষায় তা আবার কমে হয় ৬৯, ৩৫.২ এবং ১২.৪ শতাংশ। অর্থাৎ ১৯৭১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত অবিবাহিত থাকার হার বেড়েছিল, কিন্তু ২০১১ থেকে ২০১৯–২১-এর মধ্যে তিন বয়সগোষ্ঠীতেই তা কমেছে।

তবে ১৯৭১-এর সঙ্গে ২০১১ বা ২০১৯–২১-এর সরাসরি সংখ্যা তুলনা করার সময় জনসংখ্যার আকার এবং তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতির পার্থক্য বিবেচনায় রাখতে হবে। ২০১৯–২১-এর তথ্য নমুনা-ভিত্তিক সমীক্ষা থেকে এসেছে, আর ১৯৭১ ও ২০১১-এর ক্ষেত্রে জনগণনা ও অন্যান্য সরকারি পরিসংখ্যান ব্যবহৃত হয়েছে।
২০১৯–২১-এর সমীক্ষায় আরও বড় ছবি
জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা—পঞ্চম পর্বের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে ২০–৪৯ বছর বয়সি পুরুষদের ২১.৯ শতাংশ কখনও বিয়ে করেননি। ২৫–৪৯ বছর বয়সিদের মধ্যে এই হার ১২.৭ শতাংশ। তবে কম বয়সি গোষ্ঠীতে অবিবাহিত থাকার হার স্বাভাবিকভাবেই বেশি—২০–২৪ বছর বয়সিদের মধ্যে ৬৯ শতাংশ এবং ২৫–২৯ বছর বয়সিদের মধ্যে ৩৫.২ শতাংশ কখনও বিয়ে করেননি।
এই তথ্য থেকে অবিবাহিত থাকার কারণ নির্ধারণ করা যায় না। কোনও ব্যক্তি শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার জন্য, কর্মসংস্থানের অপেক্ষায়, ব্যক্তিগত পছন্দে, পারিবারিক কারণে অথবা অন্য কোনও সামাজিক কারণে বিয়ে নাও করতে পারেন। ফলে ‘অবিবাহিত’ পরিসংখ্যানকে সরাসরি ‘বিয়ে করতে পারেননি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা তথ্যগতভাবে সঠিক নয়।
বেকারত্ব ও বিয়ে—দুটি তথ্যকে এক করে দেখা যাবে না
পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক পরিস্থিতি বুঝতে গিয়ে যুব বেকারত্ব এবং অবিবাহিত থাকার হারকে পাশাপাশি রাখা যায়, কিন্তু একটিকে অন্যটির সরাসরি কারণ হিসেবে দেখানো যায় না। ২০১১–১২ থেকে ২০২০–২১-এর মধ্যে গ্রামীণ যুব বেকারত্ব বেড়েছে, কিন্তু একই সময়ে ২০–৩৪ বছর বয়সি পুরুষদের অবিবাহিত থাকার হার ২০১১-এর তুলনায় ২০১৯–২১-এ কমেছে।
বিয়ের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শিক্ষা, আয়, কর্মসংস্থান, পারিবারিক পরিস্থিতি, শহরায়ণ এবং সামাজিক পরিবর্তনের মতো একাধিক বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে বেকারত্বের ওঠানামার পেছনে শ্রমবাজার, অর্থনীতি, শিক্ষা, কোভিড-১৯ পর্ব এবং সমীক্ষা-পদ্ধতির পার্থক্যও থাকতে পারে। তাই শুধুমাত্র এই পরিসংখ্যান দিয়ে কোনও একটি সরকারের নীতি বা সময়কালকে অবিবাহিত থাকার হারের সরাসরি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
২০১১ বনাম ২০২১: সামগ্রিক ছবিতে কী দাঁড়াল?
তথ্যগুলি পাশাপাশি রাখলে পশ্চিমবঙ্গের গত এক দশকের একটি মিশ্র ছবি সামনে আসে। একদিকে রাজ্যের জনসংখ্যা ২০১১-এর ৯.১৩ কোটি থেকে ২০২১-এর প্রক্ষেপিত ৯.৮১ কোটিতে পৌঁছনোর কথা ছিল। অন্যদিকে ১৫–২৯ বছর বয়সিদের যুব বেকারত্ব গ্রামাঞ্চলে ৭.৩ শতাংশ থেকে ১০.৪ শতাংশে বেড়েছে এবং শহরে ১৩.২ শতাংশ থেকে ১৩.৪ শতাংশ হয়েছে।
কিন্তু ২০–৩৪ বছর বয়সি পুরুষদের অবিবাহিত থাকার হার একই সময়ে বাড়েনি। বরং ২০–২৪, ২৫–২৯ এবং ৩০–৩৪—তিন বয়সগোষ্ঠীতেই ২০১১-এর তুলনায় ২০১৯–২১-এ এই হার কমেছে। সবচেয়ে বেশি হ্রাস ২৫–২৯ বছর বয়সিদের মধ্যে, প্রায় ৬.৬ শতাংশ-বিন্দু।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ২০২১ সালের পূর্ণ জনগণনা না হওয়ায় ওই বছরে ঠিক কত জন যুবক অবিবাহিত ছিলেন, তার নির্ভুল জনগণনা-ভিত্তিক সংখ্যা বলা যায় না। ২০১৯–২১-এর বৈবাহিক তথ্য এসেছে জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা থেকে এবং ২০২১-এর জনসংখ্যার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে সরকারি প্রক্ষেপণ। তাই পরিসংখ্যানগুলিকে তাদের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখেই ব্যাখ্যা করতে হবে।
সব মিলিয়ে, ২০১১ থেকে ২০২১-এর কাছাকাছি সময়ের পশ্চিমবঙ্গের ছবিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও যুব বেকারত্বের চাপ যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিপরীত প্রবণতা—২০ থেকে ৩৪ বছর বয়সি পুরুষদের অবিবাহিত থাকার হার বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ এই তথ্যভাণ্ডারে নেই। বরং উপলব্ধ সরকারি ও সমীক্ষাভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ওই হার কমেছে।
