কলকাতা— শিল্প ও বিনিয়োগ টানতে নতুন শিল্পনীতি (New Industrial Policy) প্রকাশের প্রস্তুতি শুরু করেছে রাজ্য সরকার। চলতি মাসের মধ্যেই নতুন নীতি সামনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় (Tapas Roy) জানিয়েছেন, এই নীতিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য ইনসেন্টিভ (Investment Incentive)-এর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেতে চলেছে। দেশের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে বিনিয়োগ টানার প্রতিযোগিতা বাড়ায় বাংলাকেও সেই প্রতিযোগিতার উপযোগী করে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।
শনিবার নিউটাউন কনভেনশন সেন্টারে একটি অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রী জানান, নতুন শিল্পনীতি প্রকাশের জন্য দ্রুত কাজ চলছে। চলতি মাসের মধ্যেই নীতিটি প্রকাশ করা হবে। এর পর ধাপে ধাপে জমি-নীতি (Land Policy) এবং শিল্পের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য নীতিও প্রকাশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন শিল্পনীতিতে ঠিক কী ধরনের সুবিধা দেওয়া হবে, তা এখনই প্রকাশ করতে চাননি শিল্পমন্ত্রী। কারণ প্রস্তাবিত নীতিটি মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। সেই অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে সুবিধাগুলির বিস্তারিত জানানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে কেন ইনসেন্টিভকে এতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, দেশের অধিকাংশ রাজ্য এবং পশ্চিমবঙ্গের আশপাশের রাজ্যগুলির মধ্যে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। তাই অন্য রাজ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাকেও বিনিয়োগকারীদের সামনে আকর্ষণীয় সুবিধা তুলে ধরতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিযোগিতামূলক ইনসেন্টিভ প্যাকেজ (Incentive Package) তৈরির পরিকল্পনা করছে রাজ্য। অর্থাৎ, কোনও শিল্প সংস্থা বাংলায় কারখানা বা উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি করলে তারা যাতে জমি, বিদ্যুৎ, কর এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সুবিধা পায়, সেই ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে।
ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বাজেটেই শিল্পক্ষেত্রে ইনসেন্টিভ দেওয়ার জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানিয়েছিল রাজ্য সরকার। সরকারের দাবি, আগের সরকারের কর্মপদ্ধতির কারণে চলতি অর্থবর্ষে এই খাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। আগামী অর্থবর্ষ থেকে শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আনার লক্ষ্য নিয়ে এই বরাদ্দ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
শিল্পে ইনসেন্টিভ সাধারণত বিনিয়োগের খরচ কমাতে এবং নতুন প্রকল্প স্থাপনে সংস্থাগুলিকে উৎসাহ দিতে ব্যবহার করা হয়। কোনও রাজ্যে শিল্প স্থাপনের আগে বিনিয়োগকারীরা শুধু জমির দাম দেখেন না। তাঁরা বিদ্যুতের খরচ, করের সুবিধা, পরিকাঠামো, পরিবহণ ব্যবস্থা এবং সরকারি সহায়তার বিষয়গুলিও খতিয়ে দেখেন। তাই শিল্পনীতিতে দেওয়া সুবিধাগুলি বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
নতুন নীতিতে জমির ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে পারে। শিল্পের জন্য কম দামে বা নির্দিষ্ট শর্তে জমি দেওয়ার পাশাপাশি জমি কেনা বা লিজ নেওয়ার ক্ষেত্রে স্ট্যাম্প ডিউটি (Stamp Duty) কমানো বা মকুবের মতো সুবিধাও রাখা হতে পারে।
বিদ্যুৎ খরচ কমাতেও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিদ্যুৎ বিলে ভর্তুকি বা শিল্প সংস্থার বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ কমানোর ব্যবস্থা বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি শিল্প পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও সরকারি সহায়তার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই নীতির প্রভাব শুধু বড় শিল্প সংস্থার বিনিয়োগে সীমাবদ্ধ থাকবে না। নতুন কারখানা তৈরি হলে স্থানীয় স্তরে কর্মসংস্থান বাড়তে পারে। পরিবহণ, সরবরাহ, পরিষেবা এবং ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্যও নতুন বাজার তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে রাজ্যে বিনিয়োগ বাড়লে তার প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
নতুন শিল্পনীতি প্রকাশের পর জমি-নীতি-সহ একাধিক শিল্প সংক্রান্ত নীতি ধাপে ধাপে সামনে আসবে। ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য কী ধরনের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে এবং ইনসেন্টিভ পাওয়ার শর্ত কী রাখা হচ্ছে, তা নীতি প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে। বাংলাকে শিল্প বিনিয়োগের প্রতিযোগিতায় আরও এগিয়ে নিতে সরকারের এই নয়া নীতির কার্যকারিতা তাই আগামী দিনে বিশেষ নজরে থাকবে।
