সংবাদ কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টিতে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। একাংশের দাবি, ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বেঙ্গল অ্যাসেম্বলির ভোটাভুটিতে পশ্চিমবঙ্গ গঠনের পক্ষে ৫৮ জন হিন্দু প্রতিনিধি ভোট দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে হিন্দু মহাসভার প্রতিনিধি ছিলেন মাত্র একজন, ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। সেই পরিসংখ্যান তুলে ধরে অনেকে বলছেন, পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির প্রধান কৃতিত্ব এককভাবে তাঁর বলে দাবি করা ইতিহাসসম্মত নয়।
তবে ইতিহাসের অন্য একটি ব্যাখ্যা বলছে, বিষয়টি শুধু ভোটাভুটির সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং প্রশ্ন ছিল, বাংলা বিভাজনের দাবিই বা কীভাবে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এল।
তৎকালীন বাংলা ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ। মুসলিম লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় ছিল। সেই পরিস্থিতিতে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি প্রথম থেকেই যুক্তি দিয়েছিলেন যে, বাংলার হিন্দু সমাজের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার জন্য বাংলা বিভাজন প্রয়োজন। এমনকি দেশভাগের প্রশ্ন চূড়ান্ত হওয়ার আগেই তিনি বাংলাকে পৃথক করার দাবি তুলেছিলেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে হুগলির তারকেশ্বরে বাংলার বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ ও সমাজনেতাদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ইতিহাসবিদ ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার, বিজ্ঞানী ডঃ মেঘনাদ সাহা, ইতিহাসবিদ ডঃ যদুনাথ সরকার, কর্নেল এ. সি. চ্যাটার্জি-সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বাংলার হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত রাখার দাবিতে বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ঐতিহাসিকদের একাংশের মতে, সেই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির উপরই ন্যস্ত করা হয়েছিল। এরপর বাংলা জুড়ে সভা, সমাবেশ এবং জনমত গঠনের কাজ শুরু হয়। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, বাংলা বিভাজনের দাবিতে কয়েক ডজন বৃহৎ জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা এবং অন্যান্য সংগঠনের নেতারাও এই আন্দোলনে অংশ নেন।
সে সময় মুসলিম লীগ গোটা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কলকাতাকেও পাকিস্তানের অংশ করার দাবি উঠেছিল। এই পরিস্থিতিতে বাংলার হিন্দু সমাজের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। আন্দোলনের ফলে বাংলা বিভাজনের দাবিতে জনমত আরও সুসংগঠিত হয় বলে বহু গবেষক মনে করেন।
এরই প্রেক্ষাপটে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ৩ জুন পরিকল্পনায় বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে পৃথক ভোটাভুটির ব্যবস্থা করা হয়। পরে ২০ জুন বেঙ্গল অ্যাসেম্বলির ভোটে পশ্চিমাঞ্চলের প্রতিনিধিরা বিভাজনের পক্ষে মত দেন। তার ফলেই বাংলার একটি অংশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত থেকে পশ্চিমবঙ্গ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ইতিহাসবিদদের মতে, পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির পেছনে বহু রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, সমাজকর্মী এবং সাধারণ মানুষের ভূমিকা ছিল। তবে বাংলা বিভাজনের দাবিকে সংগঠিত গণআন্দোলনের রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণেই পশ্চিমবঙ্গ গঠনের ইতিহাসে তাঁর নাম বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়ে থাকে।
