November 3, 2026
রাজ্য

ভাষার স্বীকৃতি নিয়ে শুভেন্দুর সঙ্গে বৈঠক আজ

নিজস্ব সংবাদদাতা, শিলিগুড়ি—উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে রাজবংশী ও কামতাপুরী সম্প্রদায়ের ভাষার স্বীকৃতির দাবি দীর্ঘদিনের। বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজবংশী ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আশায় ছিলেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী উত্তরবঙ্গ সফরে গেলেও এত দিন এই দাবি নিয়ে কোনও বৈঠক হয়নি বলে অভিযোগ রাজবংশী নেতাদের। অবশেষে মঙ্গলবার শিলিগুড়ির উত্তরকন্যায় রাজবংশী ও কামতাপুরী নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে বসতে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার উত্তরকন্যায় প্রশাসনিক বৈঠকের পাশাপাশি দুই সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাদা করে আলোচনা করবেন শুভেন্দু। সেই বৈঠকে যোগ দিতে সকাল থেকেই উত্তরকন্যায় আসতে শুরু করেছেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতা ও প্রতিনিধিরা। তাঁদের আশা, দীর্ঘদিনের ভাষার স্বীকৃতির দাবি নিয়ে এ বার সরকারের কাছ থেকে নির্দিষ্ট আশ্বাস মিলবে। তাঁদের প্রধান দাবি, রাজবংশী ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।


নব্বইয়ের দশকে নেপালি ভাষা সংবিধানের অষ্টম তফসিলে জায়গা পাওয়ার পর থেকেই রাজবংশী ও কামতাপুরী ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন জোরদার হয়। সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলির দাবি, তাঁদের ভাষাকে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হলে নতুন প্রজন্মের কাছে মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ তৈরি হবে।

অধ্যাপক মহেন্দ্রনাথ রায়ের কথায়, তাঁদের একাধিক দাবি থাকলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল মাতৃভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি। এই ভাষাকে তাঁরা নিজেদের ভাষায় ‘মাও ভাষা’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, ভাষার স্বীকৃতি মিললে উত্তরবঙ্গের ইতিহাস, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে দেশের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ জানতে পারবেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাষাটির পাঠক্রম চালু হলে স্থানীয় পড়ুয়ারাও মাতৃভাষায় পড়াশোনার সুযোগ পাবে বলে মনে করেন তিনি।

মহেন্দ্রনাথের বক্তব্য, রাজবংশী অথবা কামতাপুরী—দুইয়ের মধ্যে যে কোনও একটি ভাষাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হোক, এটাই তাঁদের যৌথ দাবি। তবে বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে কোন ভাষার নামে স্বীকৃতি চাওয়া হবে, তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।

কামতাপুরী সংগঠনের প্রতিনিধি অষ্টমী রায়সিংহের দাবি, তাঁদের সম্প্রদায়ের মানুষের অস্তিত্ব ও পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ১৯৭০ সাল থেকেই ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন চলছে। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় একাধিক সংগঠন তৈরি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজে বৈঠকে ডেকেছেন, তাই এ বার তাঁরা আশাবাদী। একই সঙ্গে তাঁর অভিযোগ, আগের সরকার রাজবংশী ও কামতাপুরী সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন তৈরি করেছিল।



অন্য দিকে, এই অভিযোগ মানতে নারাজ রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা শিলিগুড়ির প্রাক্তন মেয়র গৌতম দেব। তাঁর দাবি, অতীতে প্রায় ৭৫ জন ভাষাবিদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছিল। রাজবংশী ও কামতাপুরী ভাষার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য না থাকলেও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলি পৃথক পরিচয়ের দাবিতে আলাদা শিবিরে ছিল। কামতাপুর পিপলস পার্টি বরাবর পৃথক পরিচয়ের দাবি জানিয়ে এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গৌতম দেবের বক্তব্য, আগের সরকার দুই ভাষা ও তাদের সংস্কৃতিকে মর্যাদা দিয়েছিল। সেখানে ‘ভাগ করে শাসন’ করার কোনও বিষয় ছিল না। এখন সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলি যদি যে কোনও একটি ভাষার স্বীকৃতিতে রাজি থাকে, তা হলে সেই দাবির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

রাজবংশী ও কামতাপুরী—কোন ভাষা সাংবিধানিক স্বীকৃতি পাবে, তা নিয়ে সংগঠনগুলির মধ্যে আলোচনা ও মতপার্থক্য রয়েছে। উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিকও এর আগে বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক করেছেন। একাধিক সংগঠনকে নিয়ে গঠিত ‘রাজবংশী মহাসঙ্ঘ’ অবশ্য রাজবংশী ভাষার স্বীকৃতির দাবিই মুখ্যমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরতে চায়। মঙ্গলবারের বৈঠকে এই দাবিগুলির বিষয়ে রাজ্য সরকার কী অবস্থান নেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে উত্তরবঙ্গের দুই সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব।

Related posts

Leave a Comment