দিল্লি— প্রতিবাদ করার অধিকার যেমন সকলের রয়েছে, তেমনই ব্যবসা ও জীবিকা নির্বাহের অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিক্ষোভের নামে কোনও নির্দিষ্ট জায়গা অনির্দিষ্টকালের জন্য দখল করে রাখা যায় না। দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে চলা আন্দোলনের জেরে ব্যবসায় ক্ষতির অভিযোগ সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে মঙ্গলবার এমনই পর্যবেক্ষণ করল সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ জানায়, প্রতিবাদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ করা হলেও তার সময়সীমা থাকা প্রয়োজন। কারণ, অন্য গোষ্ঠীরও সেখানে প্রতিবাদ জানানোর অধিকার রয়েছে।
দিল্লিতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে বিরোধী শিবির। এই দাবিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনও আন্দোলনে নেমেছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি-ও দিল্লিতে একাধিক প্রতিবাদ কর্মসূচি করেছে। লাগাতার বিক্ষোভের জেরে ব্যবসায় ক্ষতির অভিযোগ তুলেছেন রাজধানীর ব্যবসায়ীদের একাংশ। বিশেষ করে উৎসবের মরসুমে দোকানপাট বন্ধ রাখতে হওয়ায় তাঁদের বিক্রি কমেছে বলে দাবি।
মঙ্গলবার এই সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে ব্যবসায়ীদের পক্ষে সওয়াল করেন আইনজীবী মুকুল রোহতগি। তাঁর বক্তব্য, উৎসবের মরসুমে দিনের পর দিন দোকান বন্ধ থাকলে ব্যবসায়ীদের বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। বিক্ষোভের কারণে দিল্লির একাধিক এলাকায় স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। আগামী দু’মাস কোনও প্রতিবাদ বা ধরনা কর্মসূচি না করার প্রস্তাবও দেন রোহতগি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, যাঁরা প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজন করছেন, তার দায় তাঁদেরই নিতে হবে। বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত ও সময়সীমা থাকা প্রয়োজন বলেও শুনানিতে উঠে আসে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, ‘প্রতিবাদ ও ব্যবসা করার অধিকার— দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। কোনও একটি গোষ্ঠী অনির্দিষ্টকালের জন্য জায়গা দখল করে রাখতে পারে না। কৃষক, ব্যবসায়ী, আইনজীবী বা অন্য প্রতিবাদীরা কোথায় যাবেন? প্রতিবাদ করার অধিকার সকলের রয়েছে।’
প্রধান বিচারপতির মতে, প্রতিবাদের জন্য এমন জায়গা চিহ্নিত করা দরকার, যেখানে আন্দোলনের কারণে ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন কাজকর্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। একই সঙ্গে প্রতিবাদের অনুমতি দেওয়ার সময় নির্দিষ্ট সময়সীমা ও শর্ত স্পষ্ট করে দেওয়া উচিত। তাঁর বক্তব্য, এক গোষ্ঠী প্রতিবাদ করছে বলে অন্যদের সেই জায়গা ব্যবহারের অধিকার বন্ধ হয়ে যেতে পারে না।

শুনানিতে যন্তর মন্তরে প্রতিবাদের অনুমতি না দেওয়ার বিষয়টিও ওঠে। সিজেপি প্রথমে সেখানে কর্মসূচি করতে চেয়েছিল। পরে দিল্লি পুলিশ বিকল্প হিসেবে তিনটি জায়গার কথা জানায়। কেন যন্তর মন্তরে অনুমতি দেওয়া হয়নি, সেই প্রশ্নের জবাবে তুষার মেহতা জানান, গত ২০ জুলাই সেখানে এক দিনের জন্য প্রতিবাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁর দাবি, বিক্ষোভকারীরা নির্ধারিত সময়ের পরেও ১৭ দিন ধরে সেখানে অবস্থান চালিয়ে যান। এমনকি সংসদ অভিমুখে মিছিলও করেন তাঁরা।
তুষার মেহতার বক্তব্য, সংসদ একটি বিশেষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। অনুমতি ছাড়া সংসদ বা সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করে যাওয়া যায় না। অন্য দিকে, আন্দোলনকারীদের পক্ষে আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, আন্দোলনের সময় পুলিশের পদক্ষেপ ও বলপ্রয়োগের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অন্য এক আইনজীবীর বক্তব্য, ব্যবসায় ক্ষতির জন্য শুধু প্রতিবাদ কর্মসূচিকে দায়ী করা ঠিক নয়; দিল্লি পুলিশের ব্যারিকেড এবং বিধিনিষেধও বাণিজ্যিক কাজকর্মে প্রভাব ফেলেছে।
শুনানিতে ব্যবসায়ীদের সংগঠনকে আন্দোলনের আয়োজকদের মামলায় পক্ষভুক্ত করার নির্দেশও দেয় আদালত। সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য, যাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবসায় ক্ষতির অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তাঁদের বক্তব্য না শুনে এই বিষয়ে সম্পূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়। ফলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ এবং আন্দোলনকারীদের বক্তব্য— দুই দিকই বিবেচনার সুযোগ তৈরি হল।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে দিল্লির শাহিনবাগে দীর্ঘদিনের আন্দোলন সংক্রান্ত মামলাতেও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে একই ধরনের পর্যবেক্ষণ করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। সে বারও আদালত জানিয়েছিল, প্রতিবাদের অধিকার থাকলেও যখন-তখন, যেখানে-সেখানে অনির্দিষ্টকাল ধরে রাস্তা বা জনপরিসর আটকে রাখা যায় না। মঙ্গলবারের শুনানিতে ফের সেই ভারসাম্যের কথাই মনে করিয়ে দিল শীর্ষ আদালত।
