সংবাদ কলকাতা: শনিবার দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের নৈশভোজে যোগ দেবেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। আয়োজক দেশ ভারত। সেই সম্মেলনের নৈশভোজকে কাজে লাগিয়ে রাজ্যে আরও বড় বিনিয়োগ টানার চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
ব্রিকসের নৈশভোজে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি মুকেশ আম্বানীর সঙ্গেও সাক্ষাতের পরিকল্পনা রয়েছে শুভেন্দুর। রাজ্যে শিল্প ও বাণিজ্যের পরিধি বাড়াতে বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে আরও বেশি করে বাংলায় বিনিয়োগে উৎসাহিত করাই সরকারের লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন তিনি। মুম্বাই সফরের সময় মুকেশ আম্বানীর সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
অনন্ত আম্বানীর সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক কথোপকথনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, অনন্ত তাঁকে তাঁদের পরিবারের গণেশ পুজোয় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সেই উৎসবের পর মুম্বাই গিয়ে আম্বানী পরিবারের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

অন্য দিকে, আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর নিউটাউনে আদানি গোষ্ঠীর প্রস্তাবিত ২,০০০ শয্যার হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ওই অনুষ্ঠানে গৌতম আদানীর উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। প্রস্তাবিত হাসপাতালের অর্ধেক শয্যা আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য রাখার পরিকল্পনা রয়েছে বলে আগেই জানিয়েছিল রাজ্য সরকার।
বিনিয়োগের পাশাপাশি পূর্ব মেদিনীপুরের জুনপুটে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত একটি প্রকল্প নিয়েও বড় বার্তা দিয়েছেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা বা ডিআরডিও আগের তৃণমূল সরকারের কাছে প্রকল্পটি নিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিল। কিন্তু সেই চিঠির কোনও জবাব দেওয়া হয়নি। তাঁর সরকার সেই চিঠির জবাব দিয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। জুনপুটে অস্ত্র ব্যবস্থার পরীক্ষার জন্য ডিআরডিও-র একটি কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে প্রস্তাবিত প্রকল্পের বিস্তারিত এদিন জানাননি তিনি।
গত চার মাসে রাজ্যে একাধিক বড় বিনিয়োগের রূপরেখা তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করেছেন শুভেন্দু। মেজিয়ায় শ্যাম স্টিলের প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি। ওই কারখানায় বিশেষ রোবটিক ফায়ার ব্রিগেড ব্যবস্থা তৈরির কাজ চলছে এবং বিভিন্ন রাজ্য থেকে তার বরাত আসতে শুরু করেছে বলেও দাবি তাঁর।

সাঁকরাইলে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে আমূলের মিষ্টি দইয়ের বড় প্ল্যান্ট তৈরির কাজ এগোচ্ছে। উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গে আইসক্রিম প্ল্যান্ট তৈরির জন্য আমূলের জমি চিহ্নিতকরণও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। রঘুনাথপুরে অমিত মেটালিকসের নতুন প্রকল্পের ভূমিপুজো হয়ে গিয়েছে। ইউকো ব্যাঙ্কের অর্থায়নে প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকার সেই প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগোচ্ছে বলেও জানান তিনি।
হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের প্রায় ৬,০০০ কোটি টাকার সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজও শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন শুভেন্দু। দুর্গাপুজোর আগেই প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হবে বলে জানান তিনি।
শুধু বড় শিল্পগোষ্ঠী নয়, আরও ৩৩টি সংস্থাকে জমি দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, মন্ত্রিসভা ইতিমধ্যেই জমি হস্তান্তরের প্রস্তাবে ছাড়পত্র দিয়েছে। পুজোর আগে সংবাদমাধ্যম ও শিল্পপতিদের উপস্থিতিতে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির হাতে জমি তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই শিল্প প্রকল্পগুলির হাত ধরে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেরও প্রসার হবে বলে আশা করছে রাজ্য সরকার। একটি নির্দিষ্ট শিল্প হাবে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান প্রায় তিন হাজার থেকে বেড়ে সাত হাজারের কাছাকাছি পৌঁছতে পারে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ছোট শিল্প, জরি ও নকশার কাজের ক্ষেত্রেও পরোক্ষ কর্মসংস্থান বাড়বে বলে দাবি তাঁর।
শুভেন্দুর বক্তব্য, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের বড় সংস্থাগুলিকে বাংলায় টেনে আনতে পারলে রাজ্যের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন বাড়বে, তেমনই রাজস্বের ভিত্তিও আরও শক্তিশালী হবে। তাঁর কথায়, ‘পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা রয়েছে। যৌথভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব এবং এর মাধ্যমে অর্জিত রাজস্ব শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিকাঠামো খাতে কাজে লাগানো যেতে পারে।’
ব্রিকসের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থিতি এবং একই সময়ে আদানি-আম্বানীর মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ—দুই দিকেই বিনিয়োগের দরজা খুলতে সক্রিয় রাজ্য সরকার। পুজোর আগে একাধিক প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে বাংলার শিল্পক্ষেত্রে নতুন গতি আনার লক্ষ্যেই এই তৎপরতা বলে মনে করা হচ্ছে।
