32 C
Kolkata
October 1, 2026
দেশ

বাঁচালেন শতাধিক প্রাণ, স্মিত মাচ্ছারকে কুর্নিশ মোদী-জয়শঙ্করের

দিল্লি: ফ্লাইদুবাই (flydubai)-এর এফজেড১০৭৩ (FZ1073) বিমানে ককপিটের ভিতরে হামলার ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েও পরিস্থিতি সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার (Captain Smit Machchhar)। তাঁর সাহস ও উপস্থিত বুদ্ধির প্রশংসা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) এবং বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর (S Jaishankar)।

দুবাই (Dubai) থেকে তেল আবিব (Tel Aviv) যাওয়ার পথে বিমানের ককপিটে সংঘর্ষ শুরু হয়। অভিযোগ, সহ-পাইলট (Co-pilot) স্মিত মাচ্ছারকে আক্রমণ করে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। সংঘর্ষের সময় বিমানটি দ্রুত উচ্চতা হারাতে শুরু করে এবং মাচ্ছার গুরুতর আহত হন।
এরপর যাত্রী ও বিমানে থাকা অতিরিক্ত পাইলটরা হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে এনে বিমানটিকে নিরাপদে সৌদি আরবের তাবুকে অবতরণ করান।

আহত অবস্থাতেও মাচ্ছার ককপিটের দরজা খুলে দেন। এরপর কয়েকজন যাত্রী ককপিটে ঢুকে অভিযুক্ত সহ-পাইলটকে (Alleged Attacker) নিয়ন্ত্রণে আনেন। বিমানে থাকা অন্য পাইলটরাও (Off-duty Pilots) পরে ককপিটে পৌঁছে বিমান নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করেন। শেষ পর্যন্ত বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে (Tabuk Airport) জরুরি অবতরণ করে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্মিত মাচ্ছারের সাহস ও দৃঢ়তার প্রশংসা করে বলেন, সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি অন্যদের জীবন রক্ষার সংকল্প থেকে সরে যাননি। তাঁর সাহস বহু মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে এবং বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে সাহায্য করেছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে দ্রুত সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেন তিনি।

বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও স্মিত মাচ্ছারের ‘অসাধারণ সাহস’ এবং বিপদের মুহূর্তে তাঁর ‘উল্লেখযোগ্য উপস্থিত বুদ্ধি’র প্রশংসা করেছেন। জয়শঙ্কর জানান, চরম বিপদের মধ্যেও তাঁর পদক্ষেপ বহু মানুষের প্রাণ রক্ষা করেছে এবং বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

কী ঘটেছিল বিমানে
৩০ সেপ্টেম্বর ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ উড়ানটি দুবাই থেকে তেল আবিবের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। উড়ানের মাঝপথে ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়। বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, সহ-পাইলট স্মিত মাচ্ছারকে আক্রমণ করেন এবং বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। সংঘর্ষের সময় বিমানটি দ্রুত উচ্চতা হারাতে থাকে।

যাত্রীদের বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিমানটি প্রচণ্ডভাবে নিচে নামতে শুরু করে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিমানের উচ্চতা প্রায় ১৪ হাজার থেকে ১৭ হাজার ফুট পর্যন্ত কমে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে আহত মাচ্ছার ককপিটের দরজা খুলে দেন। দরজা খোলার পর যাত্রীরা ককপিটে ঢুকে সহ-পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনেন।

বিমানে থাকা অন্য পাইলটরাও পরে ককপিটে পৌঁছে বিমান নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করেন। শেষ পর্যন্ত বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। মাচ্ছারকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর শারীরিক অবস্থা গুরুতর হলেও তিনি চিকিৎসাধীন এবং নিরাপদে রয়েছেন বলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

আহত পাইলটকে চিকিৎসায় এগিয়ে এলেন যাত্রীও
বিপদের সময় শুধু ককপিটে ঢুকে হামলাকারীকে আটক করাই নয়, আহত পাইলটকে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও যাত্রীদের ভূমিকা ছিল। বিমানে থাকা এক ইজরায়েলি দন্ত চিকিৎসক চিৎকার শুনে দ্রুত ককপিটে ছুটে যান। গুরুতর রক্তক্ষরণে থাকা মাচ্ছারের প্রাথমিক চিকিৎসা করেন তিনি এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করেন।

আর এক যাত্রী ককপিটে ঢুকে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কাজে অংশ নেন। বিমান চালানোর আনুষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা না থাকলেও বিমান চলাচল নিয়ে একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান দেখার সূত্রে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর কিছু ধারণা ছিল বলে জানা গিয়েছে। বিমানটি সোজা রাখতে তিনি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করেন।

তাবুকে জরুরি অবতরণের পর ইজরায়েলে ফেরেন যাত্রীরা
তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণের পর যাত্রীরা প্রায় ছয় ঘণ্টা সেখানে ছিলেন। পরে বিকল্প ফ্লাইদুবাই বিমানে তাঁদের ইজরায়েলে নিয়ে যাওয়া হয়। মোট ১৭৪ জন যাত্রীর মধ্যে ১৬৬ জন ইজরায়েলি নাগরিক এবং আরও আটজন অন্য দেশের নাগরিক ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

বিমানবন্দরে পৌঁছনোর পর কয়েকজন যাত্রীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। আহতদের মধ্যে এক যাত্রীকে পরে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদিকে ঘটনার তদন্ত চলায় ইজরায়েলগামী এবং ইজরায়েল থেকে আসা কয়েকটি উড়ান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফ্লাইদুবাই। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও ধরনের অনুমান না করার জন্যও সংস্থার তরফে আবেদন জানানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক স্তরেও প্রশংসা স্মিত মাচ্ছারের
স্মিত মাচ্ছারের সাহসের প্রশংসা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও। ট্রাম্প আহত অবস্থাতেও ককপিটের দরজা খুলে দেওয়ার ঘটনাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। নেতানিয়াহু বলেন, যাত্রী ও ক্রুদের সম্মিলিত পদক্ষেপ বড় বিপর্যয় এড়াতে সাহায্য করেছে।

ইজরায়েলের বিদেশ মন্ত্রকও স্মিত মাচ্ছারের ভূমিকার প্রশংসা করেছে। ভারতীয় দূতাবাসসহ একাধিক কূটনৈতিক মহল তাঁর দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছে।

১৩ বছরের বেশি বিমান চালানোর অভিজ্ঞতা
স্মিত মাচ্ছারের বাণিজ্যিক বিমান চালানোর অভিজ্ঞতা ১৩ বছরের বেশি। তাঁর প্রায় ৯ হাজার ৭৫০ ঘণ্টা বিমান চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। এর আগে তিনি দীর্ঘ সময় স্পাইসজেটে কাজ করেছেন। পরে ২০২২ সালে ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেন এবং বোয়িং ৭৩৭ বিমানের পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ঘটনার তদন্ত এখনও চলছে। সহ-পাইলট কেন ককপিটে এই সংঘর্ষে জড়িয়েছিলেন এবং তাঁর উদ্দেশ্য কী ছিল, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হামলার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।

Related posts

Leave a Comment