কলকাতা, ৩ জুন: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচন ঘিরে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের সংঘাত আরও তীব্র আকার নিল। দল থেকে বহিষ্কৃত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার দাবিতে স্পিকার রথীন্দ্র বসুর কাছে চিঠি জমা দিলেন তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের বিধায়করা। ওই চিঠিতে ঋতব্রতের পাশাপাশি উপদলনেতা ও মুখ্য সচেতকের নামও প্রস্তাব করা হয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, চিঠিতে মোট ৫৮ জন বিধায়কের স্বাক্ষর রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বিদ্রোহী শিবিরের প্রস্তাব অনুযায়ী, সন্দীপন সাহা, জাভেদ খান ও শিউলি সাহাকে উপদলনেতা এবং আখরুজ্জামানকে মুখ্য সচেতক করার আবেদন জানানো হয়েছে। বুধবার স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঋতব্রতের নেতৃত্বে কয়েকজন বিধায়ক ওই চিঠি জমা দেন। স্পিকার তা গ্রহণ করলেও এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি।
বিধানসভার বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের অন্দরে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার সূত্রপাত হয়েছিল স্বাক্ষর বিতর্ককে ঘিরে। শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে মনোনীত করে যে চিঠি স্পিকারের কাছে পাঠানো হয়েছিল, সেই চিঠিতে একাধিক বিধায়কের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের ভিত্তিতে শুরু হয় তদন্ত। বর্তমানে সেই মামলার তদন্তে সিআইডি যুক্ত হয়েছে এবং একাধিক বিধায়কের সঙ্গে ইতিমধ্যেই কথা বলা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছিলেন, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাই প্রথম স্বাক্ষর জালিয়াতির বিষয়টি বিধানসভা কর্তৃপক্ষের নজরে আনেন। এরপরই বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। পরে ওই দুই বিধায়ককে দল থেকে বহিষ্কার করে তৃণমূল নেতৃত্ব।
এরপর থেকেই তৃণমূলের অন্দরে অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। একের পর এক বিধায়ক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরব হন। রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়, বিদ্রোহী শিবিরই কি ভবিষ্যতে তৃণমূলের নতুন নেতৃত্বের কেন্দ্র হয়ে উঠবে? এমনকি দলীয় প্রতীক নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
এদিকে মঙ্গলবার শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে স্পিকারের কাছে আলাদা চিঠি পাঠিয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে স্পিকার কলকাতায় না থাকায় সেই চিঠি গ্রহণ করা হয়নি বলে জানা যায়। পরদিন স্পিকার বিধানসভায় আসার পর বিদ্রোহী বিধায়কদের চিঠি গ্রহণ করেন।
তবে বিদ্রোহী শিবিরের জমা দেওয়া চিঠির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। ওই চিঠিতে এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের সভানেত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বিদ্রোহীদের লক্ষ্য আদৌ দল ভাঙা নাকি নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা— তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
বাগনানের বিধায়ক অরুণাভ সেন বলেন, “আমি এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেত্রী হিসেবেই মানি। কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কোনওদিন নেতা হিসেবে মানিনি, এখনও মানি না। তাই আমরা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেই স্পিকারের কাছে চিঠি জমা দিয়েছি।”
এখন নজর স্পিকারের সিদ্ধান্তের দিকে। বিধানসভা সূত্রে খবর, জমা পড়া স্বাক্ষরগুলির সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। সেই প্রক্রিয়া শেষ হলে বিরোধী দলনেতা পদ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হতে পারে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করে দিতে পারে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী রাজনীতির আগামী দিকনির্দেশ।
