দিল্লি — অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে আগামী সেপ্টেম্বর ভারতে আসছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে আয়োজিত এই সম্মেলনে তাঁর যোগ দেওয়ার বিষয়টি ইরানের সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা অব্যাহত থাকার সময় পেজেশকিয়ানের এই সফর হওয়ায় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে এর গুরুত্ব বেড়েছে।
ভারত ২০২৬ সালের জন্য ব্রিকসের সভাপতিত্ব করছে। এই দায়িত্বের অংশ হিসাবেই দিল্লিতে অষ্টাদশ শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চিন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে তৈরি হওয়া জোটটি গত কয়েক বছরে সম্প্রসারিত হয়েছে। মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহী ২০২৪ সালে সদস্য হয়। পরের বছর ইন্দোনেশিয়াও এই জোটে যোগ দেয়। ফলে এবারের সম্মেলনে আগের তুলনায় আরও বেশি দেশের স্বার্থ ও রাজনৈতিক অবস্থান একসঙ্গে উঠে আসবে।

এই সম্প্রসারণের মধ্যে ইরানের অবস্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তেহরান ব্রিকসের সদস্য হওয়ার পর থেকেই সদস্য দেশগুলির সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী। পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান সংঘাতের পরিস্থিতিতে সেই অর্থনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। পেজেশকিয়ানের দিল্লি সফরের সময় ভারত ও ইরানের মধ্যে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এরই মধ্যে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মতি জানিয়েছেন, ইরান নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কে যোগ দেওয়ার পথে এগোচ্ছে। ব্রিকস সদস্য দেশগুলির উদ্যোগে তৈরি এই ব্যাঙ্ক উন্নয়ন ও পরিকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন করে। তেহরানের কাছে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হওয়া অর্থনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

ইরান দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং পশ্চিমি আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প বাণিজ্যিক পথ খুঁজছে। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলির সঙ্গে জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর আগ্রহও জানিয়েছে তেহরান। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কে যোগ দেওয়ার উদ্যোগ সেই বৃহত্তর আর্থিক কৌশলের অংশ হতে পারে।
তবে ইরানের সদস্যপদ এখনও সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত ভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের ঘোষণাকে সম্ভাব্য যোগদানের ঘোষণা হিসাবেই দেখা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত কোন পর্যায়ে পৌঁছয়, সেটিও দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনের আগে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারতের দিক থেকেও ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। চাবাহার বন্দর ভারতের জন্য মধ্য এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ করিডর নিয়েও দুই দেশের সহযোগিতা রয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতার মধ্যে এই যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি সরবরাহের বিষয়গুলি ভারতের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।ব্রিকস সম্মে
লনে রাশিয়া ও চিনের শীর্ষ নেতৃত্বও উপস্থিত থাকতে পারেন। ফলে পেজেশকিয়ানের সফরের সময় একাধিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে সদস্য দেশগুলির মধ্যে আলোচনা হতে পারে।
ভারতের জন্য এবারের সম্মেলনের বড় চ্যালেঞ্জ হল, সম্প্রসারিত ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যে থাকা রাজনৈতিক মতপার্থক্য সামলে অর্থনৈতিক সহযোগিতার মূল লক্ষ্য ধরে রাখা। ইরান ও অন্য সদস্যদের অবস্থান এক নয়। ফলে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে আলোচনা হলে মতপার্থক্য সামনে আসতে পারে। একই সঙ্গে আর্থিক সহযোগিতা ও বৈশ্বিক পরিচালন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের মতো বিষয়ে সমঝোতার সুযোগও রয়েছে।
পেজেশকিয়ানের দিল্লি সফর তাই শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার ঘটনা নয়। ইরানের জন্য এটি ব্রিকসের মধ্যে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করার সুযোগ। ভারতের জন্য এটি তেহরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময়ের সুযোগ। আর ব্রিকসের জন্য এটি সম্প্রসারিত সদস্যপদের পর নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে জোটের কার্যকারিতা দেখানোর গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
