পশ্চিমবঙ্গে নাগরিক অধিকারের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস
সুভাষ পাল
১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের গ্রাম বাংলায় ভোটার তালিকায় নাম তোলার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল স্থানীয় সিপিএম নেতৃত্ব। রাজ্যে দীর্ঘ বাম জমানায় তাঁদের অধিকাংশের ভোটার হতে দেওয়া হয়নি। ফলে ২০০২ এর তালিকায় এইসব হিন্দুদের নাম ওঠেনি। তৃণমূল জমানায় তাঁদের অনেকের নাম উঠলেও এসআই আর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার ফলে এদের অনেকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যায়। এই দুর্ভোগের জন্য বামফ্রন্ট সরকার বিশেষভাবে দায়ী। সে সময় স্থানীয় সিপিএম নেতৃত্ব মনে করতো, এইসব বাংলাদেশী হিন্দুদের যদি ভোটার তালিকায় নাম উঠে যায়, তাহলে তাঁরা সকলেই বিজেপি করবে। এতে বামফ্রন্টের ভোট ব্যাঙ্কের ক্ষতি হবে। এই আশঙ্কা থেকে তাঁরা দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশ নির্যাতিত হয়ে আসা হিন্দুদের ভোটার তালিকায় নাম তোলার ক্ষেত্রে প্রধান বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। অথচ আজ যখন ন্যায় বিচার শুরু হল, তাৎক্ষণিকভাবে এই সব ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়তেই, সেইসব ভোটারদের পক্ষ নিয়ে তর্জন গর্জন শুরু করেছে সিপিএম। শুধু তাই নয়, বিজেপি-র উপর এইসব মানুষগুলোকে ক্ষেপিয়ে দিতে পাড়ায় পাড়ায় তৃণমূলও প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে উঠেছিল। অনেকেই মিথ্যা অভিযোগ করে, অথবা পঞ্চায়েত ও পৌরসভার ক্ষমতার অপব্যবহার করে এইসব হিন্দু ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে। যদিও শেষ রক্ষা হবে না।
১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসা হিন্দুদের কাছে এ রাজ্য শুধু আশ্রয়ের জায়গা ছিল না, ছিল নতুন করে জীবন শুরু করার ঠিকানা। সীমান্ত পেরিয়ে আসার পর তাঁদের অনেকেই গ্রাম বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বসতি গড়েছেন। কেউ জমি কিনেছেন, কেউ পরিত্যক্ত জমিতে ঘর তুলেছেন, কেউ স্থানীয় সমাজ ও অর্থনীতির সঙ্গে মিশে গিয়েছেন। তাঁদের সন্তান-সন্ততিরা এই বাংলাতেই জন্মেছেন, পড়াশোনা করেছেন, কাজ করেছেন। কিন্তু নাগরিক পরিচয় এবং ভোটাধিকার নিয়ে তাঁদের একাংশের সমস্যা বহু বছর ধরে থেকে গিয়েছে।
এই সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল ভোটার তালিকায় নাম তোলার প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ বাম জমানায় গ্রাম বাংলার বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু পরিবারগুলির একটি অংশকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে স্থানীয় স্তরে রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, স্থানীয় সিপিএম নেতৃত্বের একাংশের রাজনৈতিক হিসাব ছিল—এই উদ্বাস্তু পরিবারগুলি ভোটার হলে তাঁদের একটি অংশ বামফ্রন্টের বদলে বিজেপির দিকে যেতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই নাকি তাঁদের ভোটার তালিকায় নাম তোলার ক্ষেত্রে অনীহা বা বাধা তৈরি করা হয়েছিল।
এই অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর দিক হল, নাগরিক অধিকারকে যদি কখনও রাজনৈতিক আনুগত্যের অঙ্কের সঙ্গে যুক্ত করা হয়ে থাকে, তা হলে সেটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য গভীর প্রশ্ন তৈরি করে। কারণ ভোটার তালিকায় নাম থাকার বিষয়টি কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের উপর নির্ভর করার কথা নয়। একজন ব্যক্তি আইন অনুযায়ী ভোটার হওয়ার যোগ্য কি না, সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা।
তবে এই অভিযোগের ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন। স্থানীয় সিপিএম নেতৃত্ব সর্বত্র পরিকল্পিত ভাবে বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের ভোটার হতে বাধা দিয়েছিল—এমন সার্বিক সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর জন্য নির্দিষ্ট এলাকা, পরিবার, আবেদন এবং প্রশাসনিক নথির আরও প্রমাণ প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর ২০০২ সালের ভোটার তালিকা জেলা, বিধানসভা কেন্দ্র এবং বুথভিত্তিক ভাবে সংরক্ষণ করেছে। ফলে এই অভিযোগ যাচাইয়ের একটি বাস্তব ভিত্তিও রয়েছে।
২০০২ সালের ভোটার তালিকা আজকের বিতর্কে তাই শুধু একটি পুরনো নির্বাচনী নথি নয়। এটি বহু পরিবারের নাগরিক পরিচয়ের অতীত অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। নির্বাচন কমিশনের নাগরিক পরিষেবা পোর্টালেও শেষ এসআইআর ভোটার তালিকার তথ্য অনুসন্ধানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ২০০২ সালের তালিকা ব্যবহার করে পুরনো তথ্য খোঁজার সুযোগ রয়েছে।
সময়ের সঙ্গে রাজ্যের রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের পরে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, তৃণমূল আমলে বাংলাদেশ থেকে আসা বহু হিন্দু পরিবারের নাম ভোটার তালিকায় যুক্ত হলেও স্থানীয় রাজনীতির অন্য ধরনের চাপ তাঁদের সামনে এসেছে। কোথাও পঞ্চায়েত বা পুরসভার ক্ষমতার অপব্যবহার, কোথাও মিথ্যা অভিযোগ, কোথাও স্থানীয় প্রশাসনের উপর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে—এমন অভিযোগও বিভিন্ন মহল থেকে উঠে এসেছে।
এই অভিযোগগুলিও অবশ্য নির্দিষ্ট ঘটনা ও নথির ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ কোনও ভোটারের নাম বাদ পড়ার পিছনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের পাশাপাশি মৃত্যু, স্থায়ী ভাবে অন্যত্র চলে যাওয়া, দ্বৈত নাম, ভুল তথ্য বা অন্যান্য আইনসঙ্গত কারণও থাকতে পারে। ফলে কোনও নির্দিষ্ট নাম বাদ পড়লেই সেটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ থাকলে সেটিকে নথি দিয়ে পরীক্ষা না করাও সমান ভাবে সমস্যাজনক।
এখানেই এসআইআর প্রক্রিয়া নতুন করে পুরনো প্রশ্ন সামনে এনেছে। দীর্ঘদিনের ভোটার তালিকায় কার নাম ছিল, ২০০২ সালের তালিকায় কার নাম ছিল, পরবর্তী সময়ে কার নাম যুক্ত হয়েছে এবং বর্তমানে কার নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—এই ধারাবাহিকতা খতিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে তীব্র মতপার্থক্যও তৈরি হয়েছে। এক পক্ষের বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে অযোগ্য নাম বাদ দেওয়া প্রয়োজন। অন্য পক্ষের অভিযোগ, প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই দুই দাবির মাঝখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, যোগ্য কোনও নাগরিক যেন কেবল প্রশাসনিক ভুল, নথির ঘাটতি বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ভোটাধিকার না হারান।
এখানে সিএএ-র প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, ২০১৯-এ আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪-র মধ্যে ভারতে প্রবেশ করা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য নাগরিকত্বের বিশেষ বিধান করা হয়েছে। ২০২৪ সালে এই আইনের অধীনে নাগরিকত্বের আবেদন করার নিয়মও বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কার্যকর করা হয়।
অর্থাৎ ভোটার তালিকায় কোনও ব্যক্তির নাম থাকা এবং ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়টি এক জিনিস নয়। ভোটার হওয়ার জন্য নির্বাচন আইনের নির্দিষ্ট যোগ্যতা প্রয়োজন, আর সিএএ-র অধীনে নাগরিকত্বের জন্য সংশ্লিষ্ট আইনি শর্ত পূরণ করতে হয়। এই দুই বিষয়কে এক করে দেখলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
তবে ১৯৭১-পরবর্তী হিন্দু উদ্বাস্তুদের ক্ষেত্রে সিএএ একটি নতুন আইনি পথ খুলেছে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। যে পরিবারগুলি এতদিন নিজেদের নাগরিক পরিচয় নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল, তাদের একটি অংশ আইনের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে সিএএ-র মাধ্যমে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার সুযোগ পেয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সরকারি নথিতে ২০২৪ সালের সংশোধিত নিয়মে এই আবেদন প্রক্রিয়ার বিধান স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ রয়েছে।
ফলে আজকের বিতর্ককে শুধু ‘কার ভোট কোথায় গেল’—এই রাজনৈতিক অঙ্কে সীমাবদ্ধ রাখলে উদ্বাস্তু সমাজের প্রকৃত সমস্যাটি আড়ালে থেকে যায়। এর কেন্দ্রে রয়েছে কয়েক দশক ধরে পরিচয় ও স্বীকৃতির লড়াই।
যাঁরা এক সময় পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে ধর্মীয় নিপীড়ন, নিরাপত্তাহীনতা বা সামাজিক অনিশ্চয়তার কারণে ভারতে এসেছিলেন, তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের একটি বড় অংশ নিজেদের পশ্চিমবঙ্গের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করেন। তাঁদের ভোটার তালিকায় নাম থাকবে কি না, সেই প্রশ্ন তাই শুধু একটি নির্বাচনী প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কেরও প্রশ্ন।
এ কারণেই অতীতের রাজনৈতিক দায় নিয়ে আলোচনা হলে তা নথির ভিত্তিতে হওয়া দরকার। ২০০২ সালের তালিকায় কোনও পরিবারের নাম কেন ছিল না, তারা আদৌ ভোটার হওয়ার যোগ্য ছিল কি না, নাম তোলার জন্য আবেদন করা হয়েছিল কি না, আবেদন খারিজ হলে তার কারণ কী ছিল, স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা কী ছিল—এই প্রশ্নগুলির উত্তর বের করাই প্রকৃত অনুসন্ধানের কাজ।
একই ভাবে, বর্তমান এসআইআরে কোনও প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ গেলে তাঁর দাবি ও আপত্তি জানানোর সুযোগ কার্যকর ভাবে নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তালিকাকে নির্ভুল করা, কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা রাজনৈতিক মতের মানুষের ভোটাধিকার সংকুচিত করা নয়।
বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ হোক বা তৃণমূলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ—দুই ক্ষেত্রেই একই মাপকাঠি প্রযোজ্য হওয়া উচিত। অভিযোগের রাজনৈতিক পরিচয় দেখে তার সত্যতা নির্ধারণ করা নয়, বরং নথি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট মানুষের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সত্যতা যাচাই করা দরকার।
আর এখানেই সিএএ-র বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব পায়। যাঁরা আইনের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেন, তাঁদের নাগরিকত্বের আবেদন করার একটি আইনগত পথ রয়েছে। কিন্তু সেই নাগরিকত্বের প্রশ্নও প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নিষ্পত্তি হবে।
দেশভাগ, উদ্বাস্তু জীবন, ভোটার তালিকা এবং নাগরিকত্ব—এই চারটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা যায় না। কয়েক দশক ধরে যে পরিবারগুলি নিজেদের অস্তিত্বের স্বীকৃতির জন্য লড়েছে, তাদের কাছে ভোটার তালিকায় একটি নাম কখনও কখনও একটি রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেটি রাষ্ট্রের কাছে নিজের অস্তিত্বের নথিভুক্ত স্বীকৃতি।
তাই আজকের প্রয়োজন প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, নথিভিত্তিক ন্যায়বিচার। ২০০২ সালের তালিকা থেকে বর্তমান ভোটার তালিকা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে কোথায় ভুল হয়েছে, কোথায় প্রশাসনিক ব্যর্থতা হয়েছে এবং কোথাও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হয়ে থাকলে তার প্রমাণ কী—সেটি প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন।
কারণ শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের সবচেয়ে মৌলিক অধিকারগুলির একটি হল ভোটাধিকার। সেই অধিকার কারও রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার বা শাস্তি হতে পারে না। নাগরিক যদি আইন অনুযায়ী যোগ্য হন, তবে তাঁর নাম ভোটার তালিকায় থাকা উচিত; আর যদি নাগরিকত্বের বিষয়ে প্রশ্ন থাকে, তার নিষ্পত্তিও হওয়া উচিত স্বচ্ছ আইনগত প্রক্রিয়ায়।
