27 C
Kolkata
October 3, 2026
রাজ্য

নন্দীগ্রামে পা ভাঙেনি মমতার: শুভেন্দু

পুরনো নথি দেখিয়ে তদন্তের বার্তা

নিজস্ব সংবাদদাতা: ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ে চোট পাওয়ার ঘটনা নিয়ে ফের রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। তৎকালীন ঘটনার চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি সামনে এনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, মমতার পায়ে কোনও হাড় ভাঙার চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তাঁর অভিযোগ, ওই সময় পা ভাঙার যে দাবি করা হয়েছিল, তা ‘মিথ্যা প্রচার’। এই অভিযোগের ভিত্তিতে উপনির্বাচন শেষ হলে নতুন করে তদন্তের পদক্ষেপ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

২০২১ সালের ১০ মার্চ নন্দীগ্রামে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে আহত হয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই দিন হলদিয়ায় মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর তিনি নন্দীগ্রামে ফিরে যান। সেখানে রাত্রিবাস করার কথা ছিল তাঁর। বিকেলে আমদাবাদের রানিচকের গিরির বাজারে দুর্গামন্দিরে পুজো দেন এবং রাধাগোবিন্দ মহোৎসবে যোগ দেন। সেখান থেকে তাঁর কনভয় বিরুলিয়া হয়ে রেয়াপাড়ার দিকে যাওয়ার সময় ঘোল পুকুরের কাছে গ্রামের রাস্তায় ঘটনাটি ঘটে।

সেই সময় মমতা অভিযোগ করেছিলেন, গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় কয়েক জন তাঁকে ধাক্কা দিয়ে গাড়ির দরজার সঙ্গে চেপে দেন। তাঁর পায়ে গুরুতর ব্যথা হয় বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। ঘটনাটি পরিকল্পিত হামলা বলে অভিযোগ করেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী।

আহত হওয়ার পর নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসা করেন। কাছের একটি মিষ্টির দোকান থেকে বরফ এনে পায়ে দেওয়া হয় এবং ব্যান্ডেজ করা হয়। পরে গাড়ির সামনের আসনে বসতে না পারায় নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে পিছনের আসনে শুইয়ে দেন। প্রথমে নন্দীগ্রামের রেয়াপাড়ার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হলেও পরে তাঁকে কলকাতায় এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।

এসএসকেএমে তাঁর চিকিৎসার জন্য একাধিক বিশেষজ্ঞকে নিয়ে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি এমআরআই করানো হয়। চিকিৎসকদের তৎকালীন বিবৃতিতে বাঁ পায়ের গোড়ালিতে গুরুতর আঘাতের কথা জানানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পায়ে প্লাস্টার নিয়েই নির্বাচনী প্রচারে ফিরেছিলেন মমতা। হুইলচেয়ারে বসেও নন্দীগ্রামে প্রচার করেছিলেন তিনি।

সেই সময় তৃণমূলের পক্ষ থেকে ‘ভাঙা পায়ে খেলা হবে’ স্লোগানও দেওয়া হয়েছিল। নন্দীগ্রামের নির্বাচনী প্রচারে মমতা অভিযোগ করেছিলেন, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র করেই তাঁর পায়ে আঘাত করা হয়েছে। পরে সেই নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হন মমতা।

পাঁচ বছর পর সেই ঘটনাকেই সামনে এনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন শুভেন্দু। শনিবার নবান্ন থেকে চিকিৎসা-সংক্রান্ত একটি নথি দেখিয়ে তিনি দাবি করেন, ২০২১ সালের ১১ মার্চ বাঙুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেসের রেডিয়োডায়াগনোসিস বিভাগের নথিতে ফ্র্যাকচারের কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ ছিল।

শুভেন্দুর বক্তব্য, ‘৯ তারিখের পর অ্যাকশন হবে। অভিযোগ করলে যেমন তদন্ত হয়, মিথ্যা অভিযোগ করলেও ব্যবস্থা নেওয়া যায়।’ তাঁর আরও দাবি, ওই ঘটনার মাধ্যমে নন্দীগ্রামের মানুষকে অপমান করা হয়েছিল।

তবে চিকিৎসকদের বক্তব্যে বিষয়টি নিয়ে অন্য দিকও উঠে এসেছে। ২০২১ সালে মমতার চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত মেডিক্যাল বোর্ডের এক সদস্য জানিয়েছেন, একাধিক বিভাগের চিকিৎসককে নিয়ে বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। অর্থোপেডিক, সার্জারি, নিউরো মেডিসিন এবং নিউরো সার্জারির চিকিৎসকেরা সেই বোর্ডে ছিলেন। তাঁর দাবি, রোগীর স্বার্থে সব প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করেই চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

ওই চিকিৎসক আরও জানান, যে রিপোর্টটি নিয়ে বর্তমানে আলোচনা হচ্ছে, সেটি বাঁ হাঁটুর সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট। তাঁর বক্তব্য, মমতার গোড়ালি এবং পায়ের পাতাতেও আঘাত ছিল। তাই শুধু একটি সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট দেখে তাঁর সামগ্রিক চোট সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। এমআরআই, এক্স-রে এবং অন্যান্য পরীক্ষার রিপোর্টও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

চিকিৎসকদের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারে মমতাকে ফের সক্রিয় থাকতে হবে, সেই বিষয়টিও চিকিৎসার সময় বিবেচনায় রাখা হয়েছিল। মেডিক্যাল বোর্ডের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই চিকিৎসা করা হয়েছিল বলে দাবি করেছেন বোর্ডের ওই সদস্য।

চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত আরও এক চিকিৎসক জানিয়েছেন, গোড়ালি ও পায়ের পাতায় চোট ছিল এবং পায়ের পাতার ছোট হাড়গুলিও আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল। আঘাতের জায়গায় রক্ত জমাট বাঁধার কথাও তিনি জানিয়েছেন। যদিও ওই চিকিৎসক মমতার প্লাস্টার নিজে করেননি বলে দাবি করেছেন।

এই বিতর্কের মধ্যে তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ শুভেন্দুর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিষয়টি ব্যবহার করার অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, মমতার পায়ে সত্যিই চোট ছিল এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা তার সাক্ষী। মমতার পায়ের ফোলা ভাব এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি বলেও দাবি করেছেন তিনি।

ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বক্তব্যে ফের ২০২১ সালের নন্দীগ্রাম পর্বের স্মৃতি সামনে এসেছে। এক দিকে চিকিৎসা-নথির নির্দিষ্ট অংশ তুলে ধরে প্রশ্ন তুলছে সরকারপক্ষ, অন্য দিকে চিকিৎসকদের বক্তব্য সামনে এনে মমতার চোটের বাস্তবতা তুলে ধরছে তৃণমূল। ফলে পুরনো ঘটনাটি নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে।

Related posts

Leave a Comment