29 C
Kolkata
September 26, 2026
রাজ্য

মমতা-বেবির ফোনালাপে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত, নির্বাচন কমিশন ইস্যুতে বিরোধী ঐক্যের তৎপরতা

দিল্লি— পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল কংগ্রেস ও সিপিআইএমের মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন যোগাযোগের পরিস্থিতি। সিপিআইএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবির সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম, বিশেষ করে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের প্রেক্ষিতেই এই আলোচনা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সিপিআইএমের রাজনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধিতার। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেই তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান এবং ২০১১ সালে রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে। পরবর্তী সময়েও তৃণমূল ও সিপিআইএম পরস্পরের বিরুদ্ধে সরাসরি রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছে। সেই দুই শিবিরের শীর্ষ নেতার সরাসরি ফোনালাপ তাই রাজনৈতিক মহলে বিশেষ নজর কেড়েছে।

তবে সাম্প্রতিক যোগাযোগের বিষয়টি কোনও নির্বাচনী জোট বা আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক সমঝোতা হিসেবে এখনও ঘোষণা করা হয়নি। প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিরোধী দলগুলির উদ্বেগ এবং বৃহত্তর বিরোধী সমন্বয়ের সম্ভাবনা। এম এ বেবি জানিয়েছেন, বাম দলগুলির পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিরোধী দলকে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই উদ্যোগে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন।

কী নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিতর্ক?

সাম্প্রতিক বিতর্কের সূত্রপাত ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, গত কয়েক মাসে নির্বাচন কমিশনের দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়া নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এসআইআর-সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে কমিশনের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। নির্বাচন কমিশন অবশ্য জানিয়েছে, কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় এ ধরনের নথিভুক্ত মতামত থাকতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলি কমিশনের প্রক্রিয়ার অংশ।

এই বিতর্কের পর বিরোধী দলগুলি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র ২৪ সেপ্টেম্বর দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে এফআইআর করার দাবি জানান। পুলিশ সেই অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর নথিভুক্ত করেছে কি না, সেই সময় পর্যন্ত তা নিশ্চিত হয়নি।

বেবির চিঠি, তারপর মমতার উত্তর

এই পরিস্থিতিতে এম এ বেবি বিভিন্ন বিজেপি-বিরোধী দলের নেতাদের চিঠি দিয়ে নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার আহ্বান জানান। সূত্রের খবর, সেই চিঠি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও পৌঁছয়। মমতা তার জবাব দেওয়ার পরই বেবির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফোনালাপে নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা, ভোটার তালিকার সংশোধন এবং বিরোধী দলগুলির যৌথভাবে পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক করার বিষয় উঠে আসে। বেবির বক্তব্য অনুযায়ী, তৃণমূলের তরফে মমতার প্রতিক্রিয়া ছিল ইতিবাচক।

ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকের উদ্যোগ

এই যোগাযোগের পাশাপাশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গেও কথা বলেছেন বলে সূত্রের দাবি। দ্রুত ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক ডাকার বিষয়ে তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বিরোধী দলগুলির মধ্যে নির্বাচন কমিশন এবং এসআইআর নিয়ে একটি যৌথ অবস্থান তৈরির বিষয়টি সেই বৈঠকের অন্যতম আলোচ্য হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে। ৩০ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকের সম্ভাবনার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বিরোধী সমন্বয়ের পরিধি ইন্ডিয়া জোটের বাইরেও বাড়ানো যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। আম আদমি পার্টি, বিজু জনতা দল-সহ বিজেপি ও কংগ্রেসের সঙ্গে সরাসরি ইন্ডিয়া জোটে থাকা নয় এমন দলগুলিকেও কোনও যৌথ কর্মসূচিতে যুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে বাম নেতৃত্বের তরফে যোগাযোগ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

বাম শিবিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

মমতা-বেবির ফোনালাপের বিষয়টি সামনে আসার পর বাম শিবিরের মধ্যেও নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সিপিআইএম নেতা মুস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য, কোনও ব্যক্তিগত যোগাযোগের ভিত্তিতে দলের অবস্থান নির্ধারিত হয় না। তিনি ইন্ডিয়া জোট গঠনের ক্ষেত্রে প্রয়াত সীতারাম ইয়েচুরির ভূমিকার কথাও স্মরণ করিয়েছেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপির বিরুদ্ধে বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রশ্নে সিপিআইএমের দলীয় অবস্থানই শেষ কথা হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ফোনালাপকে তিনি দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের বিকল্প হিসেবে দেখেননি।

বিজেপির কটাক্ষ

অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সিপিআইএমের এই যোগাযোগকে রাজনৈতিকভাবে তুলে ধরেছে বিজেপি। বিজেপি নেতা রাহুল সিনহা দাবি করেছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী তৃণমূলের অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যায়। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল ও সিপিআইএমের মধ্যে আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে তা প্রকাশ্যে এসেছে।

বিজেপির এই বক্তব্য অবশ্য রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তৃণমূলের পক্ষ থেকে এই ফোনালাপ নিয়ে এখনও বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ফোনালাপকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক ব্যাখ্যাগুলি সামনে আসছে, সেগুলির মধ্যে দলীয় বক্তব্য ও বিরোধী দলের অভিযোগ আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।

তৃণমূল-বাম সম্পর্কের পুরনো ইতিহাসের মধ্যে নতুন যোগাযোগ

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সিপিআইএমের রাজনৈতিক সংঘাতের ইতিহাস দীর্ঘ। পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর রাজ্যের রাজনীতিতে তৃণমূল ও সিপিআইএমের বিরোধই অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক মেরুকরণের বিষয় ছিল।

তবে জাতীয় স্তরে ইন্ডিয়া জোট গঠনের পর পরিস্থিতির একটি আলাদা মাত্রা তৈরি হয়। তৃণমূল ও সিপিআইএম উভয়েই সেই বিরোধী জোটের অংশ হলেও পশ্চিমবঙ্গে দুই দলের মধ্যে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা বজায় থেকেছে। ফলে নির্বাচন কমিশন ইস্যুতে মমতা ও বেবির সরাসরি ফোনালাপকে সেই বৃহত্তর জাতীয় বিরোধী সমন্বয়ের প্রেক্ষাপটেই দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, ব্যক্তিগত ও দলীয় পর্যায়ের এই যোগাযোগ কি শুধু নির্বাচন কমিশন-সংক্রান্ত একটি নির্দিষ্ট ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি আগামী দিনে বিরোধী দলগুলির যৌথ কর্মসূচির ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত সমন্বয়ের পথ তৈরি করবে। আপাতত প্রকাশ্য তথ্য বলছে, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নির্বাচন কমিশন, এসআইআর এবং বিরোধী দলগুলির যৌথ প্রতিক্রিয়া; কোনও নতুন নির্বাচনী জোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি।

Related posts

Leave a Comment