ন্যানো গাড়ির কারখানা ঘিরে এক সময় জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় উঠে এসেছিল সিঙ্গুর। সেই সিঙ্গুরেই কি এ বার ভারী গাড়ি শিল্পের নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে? রাজ্যের নতুন শিল্পনীতি (New Industrial Policy) ঘোষণা করতে গিয়ে বৃহস্পতিবার এমনই সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। তিনি জানিয়েছেন, সিঙ্গুরে শিল্পের পরিকাঠামো পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে সরকার ইতিবাচক পদক্ষেপ করতে চায়। এ নিয়ে অশোক লে-ল্যান্ডের (Ashok Leyland) সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ে কথাও হয়েছে। তবে এখনই কোনও প্রকল্পের চূড়ান্ত রূপরেখা প্রকাশ্যে আনতে নারাজ মুখ্যমন্ত্রী।
শিল্পপতিদের আশ্বস্ত করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘সিঙ্গুর নিয়ে অবশ্যই আমরা কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করব। অশোক লে-ল্যান্ডের (Ashok Leyland) সঙ্গে আমার প্রাথমিক স্তরের কথা হয়েছে। তবে আমরা আগের সরকারের মতো দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে কেবল মৌ (MoU) স্বাক্ষর করেই দায় সারব না, তাই এখনই বিস্তারিত কিছু বলছি না।’’ তাঁর এই বক্তব্যে সিঙ্গুরে নতুন শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে অশোক লে-ল্যান্ডের সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তার প্রসঙ্গ সামনে আসায় ভারী গাড়ি নির্মাণের সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। যদিও সংস্থার সঙ্গে আলোচনার বিষয়বস্তু বা সম্ভাব্য প্রকল্পের বিনিয়োগের পরিমাণ সম্পর্কে কোনও তথ্য দেননি মুখ্যমন্ত্রী।
নতুন সরকারের মেয়াদ ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই এ দিন শিল্পনীতি (Industry Policy) ঘোষণা করেন শুভেন্দু। শিল্পে বিনিয়োগ টানতে এবং বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের জমি সংক্রান্ত সমস্যা মেটাতে সরকার কী ভূমিকা নেবে, তার ব্যাখ্যা দেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, শিল্পপতিদের নিজেদের উদ্যোগে জমি জোগাড় করার দায়িত্ব দিয়ে সরকার হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। জমি অধিগ্রহণ থেকে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সহযোগিতা করবে রাজ্য।
জমি অধিগ্রহণের নীতি নিয়ে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের ফারাক তুলে ধরে শুভেন্দু বলেন, ‘‘আমরা একদিকে যেমন বাম আমলের মতো জমির জন্য কৃষকদের ওপর গুলি চালাতে পারব না, অন্যদিকে আবার বিগত তৃণমূল সরকারের মতো শিল্পপতিদেরও বলতে পারব না যে আপনারা নিজেদের জমি নিজেরাই জোগাড় করে নিন। জমি অধিগ্রহণ ও পরিকাঠামো তৈরিতে রাজ্য সরকার পুরোপুরি শিল্পপতিদের পাশে থাকবে।’’ অর্থাৎ একদিকে কৃষকদের উপর বলপ্রয়োগ না করা এবং অন্যদিকে শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি নিশ্চিত করা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখার কথা বলেছে নতুন সরকার।
শিল্পের জমির জোগান বাড়াতে অব্যবহৃত জমি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, অতীতে শিল্পের জন্য বরাদ্দ করা হলেও যে জমিতে এখনও কোনও কারখানা গড়ে ওঠেনি, আইন মেনে সেই জমি ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, রাজ্য সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে সরাসরি জমি কিনে বড় জমি-ভাণ্ডার (Land Bank) তৈরি করা হচ্ছে। শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী সেই জমি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে রাজ্যে প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে বলেও দাবি করেছেন শুভেন্দু।
এ দিন বিগত সরকারের শিল্প সম্মেলন বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট (Bengal Global Business Summit) নিয়েও অভিযোগ তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, সম্মেলনের নামে সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা অপব্যয় হয়েছিল এবং ১৬ লক্ষ কোটি টাকার কাল্পনিক চুক্তির হিসাব দেখানো হয়েছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর শিল্প দপ্তরের সচিবের কাছে প্রকৃত কাজের খতিয়ান চেয়েছিলেন বলে জানান তিনি। সচিবের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে তাঁর দাবি, কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও বিনিয়োগকেও ওই সম্মেলনের সাফল্য হিসেবে দেখানো হয়েছিল। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে প্রাক্তন সরকারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সিঙ্গুরে অশোক লে-ল্যান্ডের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা কতটা এগোয়, তার উপরই নির্ভর করবে সেখানে নতুন শিল্পের সম্ভাবনা কতটা বাস্তব রূপ পায়। আপাতত মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, শুধু বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি নয়, শিল্প স্থাপন এবং কর্মসংস্থান তৈরির বাস্তব ফল দেখতে চায় তাঁর সরকার।
