মৃতের পরিবারকে সাহায্যের ঘোষণা শুভেন্দুর
হালিশহর: পুলিশ হেফাজতে বিরজু কুমারের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার মধ্যেই সোমবার হালিশহরে পৌঁছে মৃতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্য পুলিশের ডিজি, বারাকপুরের পুলিশ কমিশনার, মন্ত্রী অর্জুন সিং, সুমনা সরকার এবং স্থানীয় বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে নিহতের বাড়িতে যান তিনি। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার পর হালিশহর থানার আইসিকে ক্লোজ এবং ঘটনার তদন্তকারী আধিকারিককে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত জানান মুখ্যমন্ত্রী।
পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি মৃতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কথাও ঘোষণা করেন শুভেন্দু। নিহতের স্ত্রীকে মুখ্যমন্ত্রীর অ্যাটেনডেন্ট পদে চাকরি দেওয়ার কথা জানান তিনি। এই পদে মাসে ১৫ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হয় এবং এক বছর কাজ করার পর গ্রুপ ডি পদে যাওয়ার সুযোগ থাকে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

নিহতের দুই সন্তানের পড়াশোনার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর তহবিল থেকে ১০ লক্ষ টাকার আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়েছে। পরিবারের আর্থিক ভবিষ্যৎ যাতে অনিশ্চিত না হয়ে পড়ে, সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানানো হয়েছে।
হালিশহরে মৃতের বাড়ি থেকে বেরিয়ে শুভেন্দু বলেন, নিহতের স্ত্রী তাঁকে একটি লিখিত চিঠি দিয়েছেন। সেখানে পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছিল বলে জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, পরিবারের পক্ষ থেকে যে দাবি করা হয়েছে, তার ভিত্তিতেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হয়েছে।
চাকরির প্রসঙ্গে শুভেন্দু বলেন, পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের নিয়ম থাকায় সরাসরি সরকারি চাকরি দেওয়ার সুযোগ নেই। সেই কারণেই মুখ্যমন্ত্রীর অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে চাকরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিহতের স্ত্রী সেই প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

বিরজু কুমারের মৃত্যুর ঘটনাটি ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। পরিবারের দাবি, গত শুক্রবার রাতে উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচরাপাড়ার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা বিরজুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরিবারের বক্তব্য, গ্রেপ্তারের পর মেডিক্যাল পরীক্ষার সময় তিনি সুস্থ ছিলেন। কিন্তু গভীর রাতে পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন তাঁর মৃত্যু হয়।
পরিবারের তরফে পুলিশি অত্যাচারের অভিযোগও তোলা হয়েছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং তাঁর উপর কোনও ধরনের অত্যাচার হয়েছিল কি না, তা তদন্ত ও চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রতিবেদনের আগে নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
শুভেন্দু বলেন, পুলিশ লকআপে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, এটা সত্যি। তবে কী ভাবে এবং কতটা অত্যাচারের কারণে মৃত্যু হয়েছে, তা তদন্তের রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত বলা সম্ভব নয়। তাঁর বক্তব্য, রিপোর্ট হাতে আসার পরেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
ঘটনার গুরুত্ব বুঝে তদন্তের ক্ষেত্রেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সাধারণত এই ধরনের ঘটনায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বা মহকুমাশাসকের মাধ্যমে তদন্ত করা হয়। কিন্তু এই ঘটনায় জেলাশাসককে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যসচিবের তরফে এ বিষয়ে সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
হালিশহরে দাঁড়িয়ে শুভেন্দু আরও বলেন, বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে পুলিশি গুলি চালানো, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, বোমাবাজি, বন্দুকের ব্যবহার এবং পুলিশ বা রাজনৈতিক হেফাজতে মৃত্যুর বহু ঘটনা রয়েছে। তাঁর দাবি, অতীতে কোনও মুখ্যমন্ত্রী রাজ্য পুলিশের ডিজিকে সঙ্গে নিয়ে রাজনৈতিক ভাবে ভিন্ন মত পোষণ করা কোনও পরিবারের বাড়িতে গিয়ে দেখা করেছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এই ঘটনার ক্ষেত্রে নিহতের পরিবারের স্থানীয় প্রশাসনের উপর আস্থা রাখার বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, মৃতের পরিবার বিচার চেয়েছে এবং সেই বিচার দেওয়ার দায়িত্ব রাজ্য প্রশাসনের। মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করার সুযোগ না দিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত ভাবে বিচার চাওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পুলিশ হেফাজতে বিরজুর মৃত্যুর অভিযোগ ঘিরে এক দিকে তদন্ত শুরু হয়েছে, অন্য দিকে পুলিশ প্রশাসনের দুই আধিকারিকের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পরিবারের আর্থিক সহায়তা, চাকরি এবং শিশুদের পড়াশোনার জন্য অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্তও ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে ঘটনাটি ঘিরে তদন্তের পাশাপাশি প্রশাসনের পদক্ষেপের দিকেও এখন নজর রয়েছে।
