সংবাদ কলকাতা: চোরবাগান সর্বজনীনের দুর্গাপুজোয় পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় এবার পুলিশের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে লালবাজার। সপ্তমীর সন্ধ্যায় মণ্ডপ চত্বরে ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা পুলিশ আধিকারিক ও কর্মীদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তাঁদের দায়িত্ব কী ছিল, ভিড় সামলাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোনও গাফিলতি ছিল কি না, তা জানতেই সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
গত ১৭ অক্টোবর উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের দুর্গাপুজোয় পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু হয়। মর্মান্তিক এই ঘটনার পর থেকেই মণ্ডপে নিরাপত্তা, দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও বেরোনোর ব্যবস্থা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার তদন্তে ইতিমধ্যেই একাধিক পদক্ষেপ করেছে পুলিশ। এবার সেদিন দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্মীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগান সর্বজনীনে কারা দায়িত্বে ছিলেন, তার একটি বিস্তারিত তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। বিশেষ করে মণ্ডপের প্রবেশ ও বেরোনোর পথে যাঁরা দায়িত্ব সামলেছিলেন, তাঁদের কাজের উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন পুলিশ কী পদক্ষেপ করেছিল, সেই বিষয়টিও তদন্তকারীদের নজরে রয়েছে।

কলকাতা পুলিশের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের বক্তব্য অনুযায়ী, সেদিন কোথায় কোন আধিকারিক ও কর্মী দায়িত্বে ছিলেন, তার তালিকা এবং বিস্তারিত রিপোর্ট পুলিশের হাতে এসেছে। এবার সংশ্লিষ্টদের ডেকে তাঁদের বক্তব্য শোনা হবে। সোমবার থেকে ধাপে ধাপে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হতে পারে বলে খবর।
তদন্তে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। মণ্ডপে দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও বেরোনোর পথ যথেষ্ট নিরাপদ ছিল কি না, অতিরিক্ত ভিড়ের পরিস্থিতি আগেভাগে আঁচ করা হয়েছিল কি না এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত পুলিশকর্মী মোতায়েন ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। কোনও পুলিশ আধিকারিক বা কর্মীর দায়িত্ব পালনে গাফিলতি ছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও নির্দিষ্ট পুলিশ আধিকারিক বা কর্মীকে দায়ী করা হচ্ছে না। জিজ্ঞাসাবাদ এবং অন্যান্য তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখার পরই ঘটনার সময় পুলিশের ভূমিকা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
রাজ্য মানবাধিকার কমিশনেরও হস্তক্ষেপ
চোরবাগান দুর্ঘটনায় ১৯ জনের প্রাণহানির ঘটনায় রাজ্য মানবাধিকার কমিশনও স্বতঃপ্রণোদিতভাবে পদক্ষেপ করেছে বলে খবর। আগামী সপ্তাহে কমিশনে এই ঘটনা নিয়ে শুনানি হতে পারে। সেই ক্ষেত্রে তদন্তকারী পুলিশ আধিকারিকদের হাজির হতে বলা হতে পারে। মৃতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের বক্তব্য জানার উদ্যোগও নেওয়া হতে পারে।

উৎসবের মরশুমে এমন মর্মান্তিক ঘটনার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শুধু আয়োজক সংস্থা নয়, পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই এখন তদন্তের অন্যতম লক্ষ্য।
রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই এই ঘটনার তদন্তের জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতীর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করেছে। দলটির কাজের মধ্যে রয়েছে দুর্ঘটনার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা, সম্ভাব্য গাফিলতি চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে বড় জমায়েতে নিরাপত্তা বাড়ানোর সুপারিশ করা। ফলে পুলিশের অভ্যন্তরীণ জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি বিশেষ তদন্তকারী দলের অনুসন্ধানেও চোরবাগান বিপর্যয়ের বিভিন্ন দিক উঠে আসতে পারে।
