সংবাদ কলকাতা: এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে কলকাতা হাই কোর্টে প্রায় ১৯৫টি মামলা দায়েরের তথ্য সামনে আসতেই বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার রুখতে নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলল আদালত। ওই মামলাগুলির মধ্যে ৪৩টি জনস্বার্থ মামলা (পিআইএল) বলে শুনানিতে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, গত ন’বছরে তথ্যের অধিকার আইনে (আরটিআই) ৩১৬টি আবেদন করে হাজারেরও বেশি প্রশ্ন তোলার তথ্যও আদালতে পেশ করেছে উত্তর দমদম পুরসভা। এই পরিস্থিতিতে মহারাষ্ট্র, রাজস্থান ও তামিলনাড়ুর ধাঁচে পশ্চিমবঙ্গেও ‘ভেক্সেশাস লিটিগেশন (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট’ বা হয়রানিমূলক মামলা প্রতিরোধ আইন চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছে কলকাতা হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ।
প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগে এবং বিচারপতি ওম নারায়ণ রাইয়ের ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, রাজ্যে এ ধরনের আইন প্রণয়নের সময় এসেছে। আদালতের মতে, একই ব্যক্তি বারবার মামলা দায়ের করলে বিচারব্যবস্থার উপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি হতে পারে। এর ফলে আদালতের মূল্যবান সময় ব্যয় হওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত অভিযোগ নিয়ে বিচার চাইতে আসা মানুষের মামলার নিষ্পত্তিতেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ন’বছরে ৩১৬টি আরটিআই আবেদন
আদালতে উত্তর দমদম পুরসভার তরফে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, মামলাকারী বিপ্লব কুমার চৌধুরী গত ন’বছরে তথ্যের অধিকার আইনে ৩১৬টি আবেদন করেছেন। ওই আবেদনগুলিতে প্রশ্নের সংখ্যা এক হাজারেরও বেশি বলে জানানো হয়েছে। পুরসভার বক্তব্য, বিপুল সংখ্যক আবেদন এবং একের পর এক মামলা দায়েরের ফলে প্রশাসনিক কাজকর্ম ও বিচারপ্রক্রিয়ার উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
শুনানিতে আরও জানানো হয়, বিপ্লব কুমার চৌধুরী কলকাতা হাই কোর্টে প্রায় ১৯৫টি মামলা দায়ের করেছেন। তার মধ্যে ৪৩টি জনস্বার্থ মামলা। এ ছাড়া, ২০২৩ সালে রাজ্য তথ্য কমিশন তাঁর দায়ের করা ৫৪৯টি মামলা নিষ্পত্তি করেছিল বলেও আদালতে উল্লেখ করা হয়।
এই পরিসংখ্যান সামনে আসার পর মামলাটির নির্দিষ্ট বিষয় ছাড়িয়ে বারবার মামলা দায়েরের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে বৃহত্তর আইনি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে মামলা বা আরটিআই আবেদনের সংখ্যা বেশি হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়রানিমূলক বলে বিবেচিত হয় না। কোনও আবেদন বা মামলা গ্রহণযোগ্য কি না, তা তার বিষয়বস্তু ও প্রাসঙ্গিক আইনি পরিস্থিতির ভিত্তিতেই বিচার্য।
ভবিষ্যতে জনস্বার্থ মামলা দায়েরের আগে যাচাই
বিপ্লব কুমার চৌধুরীর ভবিষ্যতে দায়ের করা জনস্বার্থ মামলার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ। কলকাতা হাই কোর্টের রেজিস্ট্রিকে বলা হয়েছে, তাঁর কোনও আবেদন জনস্বার্থ মামলার বৈশিষ্ট্যযুক্ত হলে সেটিকে সরাসরি পিআইএল হিসেবে নথিভুক্ত করা যাবে না। প্রথমে উপযুক্ত বিচারপতির বেঞ্চের সামনে আবেদনটি পেশ করতে হবে। সেটি আদৌ জনস্বার্থ মামলা হিসেবে গ্রহণযোগ্য কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই পরবর্তী পদক্ষেপ করা যাবে।
অর্থাৎ, ভবিষ্যতে তাঁর দায়ের করা কোনও আবেদনকে জনস্বার্থ মামলা হিসেবে বিবেচনা করার আগে বিচারবিভাগীয় যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। তবে এই নির্দেশের মাধ্যমে তাঁর আরটিআই আবেদন করার অধিকার খর্ব করা হয়নি। একই সঙ্গে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অপব্যবহার হয়ে থাকলে উত্তর দমদম পুরসভা নিজস্ব আইনি পদক্ষেপ করতে পারবে বলেও স্পষ্ট করেছে আদালত।
রাজ্যে নতুন আইন আনার বিষয়ে পরামর্শ
মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে অতিরিক্ত সরকারি আইনজীবী অজিতকুমার মিশ্রকে অ্যাডভোকেট জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তাবিত আইন সম্পর্কে রাজ্য সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। মহারাষ্ট্র, রাজস্থান ও তামিলনাড়ুতে এ ধরনের আইন রয়েছে বলে উল্লেখ করে পশ্চিমবঙ্গেও অনুরূপ আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে ডিভিশন বেঞ্চ।
এ ধরনের আইনের মূল উদ্দেশ্য হতে পারে, হয়রানি করার উদ্দেশ্যে দায়ের করা মামলা চিহ্নিত করা এবং বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার প্রতিরোধ করা। তবে নতুন আইন তৈরি হলে প্রকৃত জনস্বার্থের মামলা এবং প্রশাসনের জবাবদিহি চেয়ে করা আবেদন যাতে অযথা বাধার মুখে না পড়ে, তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
৫০ হাজার টাকার ডিমান্ড ড্রাফট জমা
শুনানিতে মামলাকারীর উপর আগে আরোপ করা জরিমানার বিষয়টিও উঠে আসে। আদালতে পেশ করা নথি অনুযায়ী, আগের মামলাগুলিতে তাঁর উপর ২৫ হাজার ও ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা ধার্য করা হয়েছিল। বর্তমান শুনানিতে তিনি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের নামে ৫০ হাজার টাকার ডিমান্ড ড্রাফট জমা দেন। ওই অর্থ নির্দিষ্ট সংস্থার কাছে পাঠানোর জন্য রেজিস্ট্রিকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
যে মামলাকে কেন্দ্র করে এই নির্দেশ, শেষ পর্যন্ত মামলাকারী সেটি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। তবে মামলা প্রত্যাহার করা হলেও ভবিষ্যতে তাঁর জনস্বার্থ মামলার আবেদন যাচাইয়ের বিষয়ে আদালতের নির্দেশ বহাল রয়েছে।
