29 C
Kolkata
October 22, 2026
কলকাতা

চোরবাগান বিপর্যয়ের তদন্তে SIT-কে তিন মাস সময়

সংবাদ কলকাতা, ২২ অক্টোবর: সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে একাধিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে কলকাতা পুলিশ ও রাজ্য সরকারের গঠিত তদন্ত কমিশন। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, ভিড় নিয়ন্ত্রণে গাফিলতি এবং মণ্ডপ থেকে ‘ভেঙে পড়ছে’ বলে ঘোষণা ঘিরে আতঙ্ক ছড়ানোর বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতীর নেতৃত্বে ছ’সদস্যের তদন্ত কমিশনকে তিন মাসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। অন্য দিকে, তদন্তের স্বার্থে আপাতত বন্ধ রয়েছে মণ্ডপের স্বাভাবিক কার্যকলাপ। পুলিশি ছাড়পত্র না মেলা পর্যন্ত প্রতিমা নিরঞ্জনের দিনও স্থির হয়নি।

আলো ঝলমলে পুজোর সন্ধ্যায় যে মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় উপচে পড়েছিল, দুর্ঘটনার পর সেই চোরবাগানেই নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। মণ্ডপ ঘিরে রেখেছে পুলিশ। পুজো উদ্যোক্তাদের সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার মণ্ডপে দেবীবরণ হয়নি। তবে প্রথা মেনে ঘট বিসর্জন করা হয়েছে। প্রতিমা নিরঞ্জন এখনও বাকি। তদন্তের প্রয়োজনে ঘটনাস্থল খতিয়ে দেখার পরেই পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে।

রাজ্য সরকার ঘটনার অনুসন্ধানে বিশেষ কমিশন গঠন করতে চাইলেও তার নেতৃত্বে কর্মরত বিচারপতিকে রাখার আবেদন গ্রহণ করেনি কলকাতা হাই কোর্ট। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ইচ্ছা অনুযায়ী কর্মরত বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্তের প্রস্তাব নিয়ে রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ অগ্রবাল প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগের কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি জানান, এ ধরনের অনুসন্ধানে কর্মরত বিচারপতিকে যুক্ত করা যাবে না। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে কমিশন গঠনের নির্দেশের পর নবান্ন ছ’সদস্যের কমিটি গঠনের বিজ্ঞপ্তি জারি করে।

কমিশনের নেতৃত্বে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতী। সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বিপর্যয় মোকাবিলা ও নাগরিক সুরক্ষা দফতরের সচিব, রাজ্য স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের মহানির্দেশক, রাজ্য পুলিশের মহানির্দেশকের প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্র দফতরের প্রতিনিধি এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর এক সদস্য। দুর্ঘটনার সময় ঠিক কোথায় প্রথম ভিড়ের চাপ তৈরি হয়েছিল, মণ্ডপের ধারণক্ষমতার তুলনায় দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশি ছিল কি না, প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ যথেষ্ট প্রশস্ত ছিল কি না এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল, তা খতিয়ে দেখবে কমিশন। বৃষ্টি কিংবা মণ্ডপ ভেঙে পড়ার গুজব পরিস্থিতি জটিল করেছিল কি না, তাও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

দিকে কলকাতা পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দলও পৃথকভাবে তদন্ত চালাচ্ছে। গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী কমিশনার পদমর্যাদার এক আধিকারিকের নেতৃত্বে গঠিত দলটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করেছে। ঘটনার সময় উপস্থিত সিভিক ভলান্টিয়ার ও পুজো কমিটির সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে দুর্ঘটনার ঘটনাক্রম পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে।

বুধবার ও বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে গিয়ে মণ্ডপের বিভিন্ন অংশ খতিয়ে দেখে তদন্তকারীরা। পরে ফরেনসিক বিভাগের সদস্যেরা নমুনা সংগ্রহের পাশাপাশি ত্রিমাত্রিক ক্যামেরায় গোটা মণ্ডপ ও আশপাশের অংশের ছবি তুলে রাখেন। মণ্ডপ ভেঙে ফেলার আগে প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহ করাই এই পদক্ষেপের অন্যতম উদ্দেশ্য। ত্রিমাত্রিক নথি বিশ্লেষণ করে মণ্ডপের কাঠামো, চলাচলের পথ এবং ভিড়ের সম্ভাব্য গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োগুলিও তদন্তকারীদের নজরে রয়েছে। একটি ভিডিয়োয় গ্রিল দিয়ে ঘেরা ঘোরানো পথে কয়েক জন দর্শনার্থীকে অসুস্থ হয়ে পড়ে যেতে দেখা গিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অন্য একটি ভিডিয়োয় মণ্ডপের বাইরের গেট থেকে আট থেকে দশ মিটার ভিতরে প্রবল ঠেলাঠেলি ও ধাক্কাধাক্কির দৃশ্য রয়েছে। আতঙ্কিত দর্শনার্থীদের চিৎকার এবং এক পুলিশকর্মীর ফোনে যোগাযোগের চেষ্টার দৃশ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের দাবি, বিশৃঙ্খলার মধ্যে মাইকে ‘মণ্ডপ ভেঙে যাচ্ছে’ বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। এর পরেই দর্শনার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বাইরে বেরোনোর জন্য হুড়োহুড়ি আরও বেড়ে যায়। বাজেয়াপ্ত সিসি ক্যামেরার ফুটেজে ওই ঘটনাক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ইঙ্গিত মিলেছে বলে তদন্তকারী সূত্রের দাবি। তবে ঘোষণার প্রকৃত প্রেক্ষাপট ও মৃত্যুর ঘটনায় তার ভূমিকা এখনও নিশ্চিত হয়নি।

ইতিমধ্যে পুজো কমিটির দুই কর্মকর্তাসহ সাত জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মুখ্যমন্ত্রী এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের বার্তা দিয়েছেন। পাশাপাশি পৃথক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং দলও গঠন করা হয়েছে, যেখানে কলকাতা পুলিশ ও পুরসভাকে রাখা হয়নি বলে জানা গিয়েছে। এখন তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ, সম্ভাব্য গাফিলতি চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে পুজোর ভিড় নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন, তা স্পষ্ট করা।

Related posts

Leave a Comment